আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই ঘুম থেকে ওঠার জন্য অথবা দৈনন্দিন কাজের কর্মসূচি মনে করিয়ে দেবার জন্য অ্যালার্ম ঘড়ি ব্যবহার করেন। যদিও আমরা মনে করতে পারি যেএই শব্দ সংকেত আমাদের স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে, আসলে তা আমাদের কর্মসূচিকে চালিয়ে নিতে বাধ্য করে। আমি যেটি বলতে চাইছি অ্যালার্মের উপর নির্ভরশীলতা হয়তো প্রতি রাত্রে আপনার নিশ্চিত ঘুমের পরিপন্থী হতে পারে, সারাদিনের কাজে নিজেকে টেনে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা। এবং অনিদ্রা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ বাড়ার সাথে সাথে আমরা ধৈর্যহীনতার স্বীকার হই।
আপনার দিনটি সুন্দরভাবে শুরু করার সবচাইতে ভাল পন্থা হিসেবে জানা প্রয়োজন আপনি স্বাভাবিক ভাবে নিজেকে কিভাবে জাগিয়ে তুলবেন। তবে অবিলম্বেই সেই পদ্ধতি শুরু করতে পারবেন না, যেহেতু আপনার জীবন শৈলীর কিছু পরিবর্তন করা এক্ষেত্রে অপরিহার্য।
শব্দ সংকেত ব্যতীত জেগে ওঠার দশটি বিস্ময়কর পদ্ধতি
উপযোগী কাজ করুন
আপনি যদি আপনার পূর্বপুরুষদের দৈনন্দিন সময়সূচি উঁকি দিয়ে দেখেন ( যখন কোন ঘড়ি/ অ্যালার্ম ছিল না), আপনি তাঁদের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন দেখে আশ্চর্য হবেন। এটি সুযোগ সুবিধার অভাবের জন্যই শুধু নয়, প্রতিদিনের কাজের প্রতি সমর্পণই তাঁদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছিল। তাঁরা সর্বদা ভোর হওয়ার পূর্বেই জেগে উঠতেন এবং সূর্যাস্তের পরেই বিছানায় চলে যেতেন। আপনি লক্ষ্য করতে পারেন যেদিন আপনার সারাদিন খুব পরিশ্রম যায়, আপনার ভাল ঘুম হয়, কিন্তু অত্যাধিক নয়, আপনি যতখানি সহজ ভাবে করতে পারবেন ততটাই , সুতরাং গভীর ঘুমের জন্য আপনার মন এবং শরীরকে ক্লান্ত করাটা আবশ্যক।
মনকে খুশি রাখলে কাজ অনায়াসেই হয়ে যায়। লাভদায়ক কার্যকারিতার এটিই কৌশল।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
আপনার নিদ্রা কত ঘন্টা হচ্ছে তার হিসাব রাখুন
যদিও এটি আলোচনার বিষয় হতে পারে যে প্রতিটি শরীরের ভিন্ন ভিন্ন কার্যকারিতা, তবু আপনি কত ঘন্টা ঘুমাচ্ছেন তার হিসাব রাখা উচিত। যদিও গবেষণায় বলা হচ্ছে একজনের রাত্রিতে অন্ততঃপক্ষে সাত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত, ব্যক্তি বিশেষের উপর সময়টির তারতম্য ঘটতে পারে। প্রাথমিক ভাবে ঘুমের স্তরের উপর এটি নির্ভর করে, যেখানে ‘ রেম’ (rapid eye movement) স্তরটিকেও ধরা হয়। কিছু ব্যক্তি মাত্র চার ঘন্টা গভীর নিদ্রার পর নিজেকে সতেজ এবং প্রাণবন্ত অনুভব করেন, কারো ক্ষেত্রে এটি ন’ ঘন্টাও লাগতে পারে। সুতরাং আপনার শরীরের জন্য ঘুমের সময়কালটি জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই অনুযায়ী প্রতিদিনের কাজের তালিকা অনুসরণ করা উচিত। এইভাবে অ্যালার্মের সাহায্য ছাড়াই আপনি নিজেকে জাগাতে পারবেন।
শারীরিক ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত হোন
শারীরিক ক্রিয়াকলাপ দেহের সমগ্র অংশে রক্ত সঞ্চালনে সহায়ক হয়। যখন আপনি শরীরকে প্রসারিত করেন বা দৌড়ান, তখন পেশীগুলো কর্মক্ষম হয় এবং আপনাকে ক্লান্ত করে তোলে। এই উদ্দীপনা আপনাকে সুনিদ্রা প্রদান করে, স্বেদগ্রন্থিগুলিকে উজ্জীবিত করে এবং মনকে সক্ষম রেখে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার অবসান ঘটায়। সুতরাং আপনার খেলাধুলা বেছে নিন এবং তাতে সংশ্লিষ্ট থাকুন। যখন এই ক্রিয়াকলাপগুলি আপনি শুরু করবেন এইগুলির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবেন। মজার পদ্ধতির মধ্যে এটি একটি যা অ্যালার্ম ছাড়াই আপনাকে জেগে উঠতে সাহায্য করবে। যখন আপনি এই কাজগুলির মাধ্যমে আনন্দ নিতে শুরু করবেন তখন এগুলি প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হবে।
আপনার মনকে ব্যস্ত রাখুন
প্রতিটি দিন কোন সৃজনশীল কাজের প্রতি নিজেকে মনোযোগী করে তুলুন। নতুন উৎসাহ আপনার মস্তিষ্কের কোষগুলিকে সচল রাখবে, আপনি যখন কোন উৎসাহব্যঞ্জক কাজ করার প্রত্যাশায় থাকবেন তখন অ্যালার্ম ছাড়া নিজেই জেগে উঠবেন।
জীবনে বিশৃঙ্খলা আছে এবং জীবনে শৃঙ্খলার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা অবশ্যই উভয়কে মর্যাদা দেব। অনিয়মানুবর্তিতা থেকে সিদ্ধি এবং নিয়মানুবর্তিতা থেকে স্বচ্ছন্দতা প্রাপ্ত হয়।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
পূর্ণ মনোযোগিতা অভ্যাস করুন
ধ্যান এবং গভীর শ্বাসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মনোযোগ পাওয়া পাওয়া যায়। এটি আপনার দুঃসময়ে আপনাকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে, আপনি স্বয়ং সমাধান খুঁজে নিতে সক্ষম হন। এবং যখন আপনি সচেতনতার সঙ্গে নিজেকে বলেন যে, নির্মল চিন্তার সঙ্গে দিনটি শুরু করা প্রয়োজন তখন অ্যালার্ম ছাড়াই আপনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।
প্রকৃতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান
আমরা যা কিছুই করি তা প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত, সুতরাং প্রকৃতির আবর্তনের প্রতি আপনার আস্থা রাখা উচিত। আপনি যখনই প্রকৃতিকে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন তার সঙ্গে আপনার সংযোগ অনুভূত হবে। আপনি যখনই জেগে উঠবেন আপনার দিন শুরু করার অনুপ্রেরণা লাভ করবেন। এখনো যদি আপনি এই অভিজ্ঞতা সঞ্চয় না করে থাকেন, অবশ্যই অন্তত আধঘণ্টা প্রতিদিন প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকুন এবং খুব মনোযোগের সঙ্গে পাতার মর্মর ধ্বনি, পাখিদের কূজন, ফুল ফোটা, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করুন, প্রকৃতির যাদু অনুভব করুন।
আপনার আহার্য বস্তু পরিশোধিত করুন
বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে খাদ্যে দূষণ যখন অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনি যেটি গ্রহণ করবেন সেটি সম্পূর্ণ রূপে পরীক্ষা করে নিতে ভুলবেন না। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণে আপনি হজমের সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন এবং সর্বক্ষণ আলস্য অনুভব করবেন, এমনকি দিনের বেলা ঘুমিয়ে পড়তেও পারেন। অপরপক্ষে তাজা ফল, সবজি এবং ঘরে তৈরী খাবার আপনাকে পুষ্টি জোগাবে, আপনার নিদ্রার ধরনকেও উন্নত করবে। গভীর ঘুম যথাসময়ে আপনাকে জেগে উঠতে সাহায্য করবে। আর তখন ঘুম থেকে জাগার জন্য আপনার অ্যালার্মের প্রয়োজন হবে না।

আপনি আপনার জীবনের দায়িত্ব গ্রহণ করুন
আপনি যখন জীবনের দায়িত্ব নিয়ে তার সম্পর্কে দায়িত্বশীল হবেন তখন আপনি সবচেয়ে সুন্দরভাবে জীবন যাপন করার উৎসাহ বোধ করবেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেকে যতটা উৎসাহিত করতে পারবেন, বাকি কোন কিছুই আপনাকে ততটা উৎসাহিত করতে পারবেনা। ভ্রমণ করুন, বই পড়ুন, ঠান্ডা জলে স্নান করুন, গান শুনুন অথবা বন্ধুকে নিয়ে আপনি আপনার পছন্দ মত দিনটি উপভোগ করুন। জীবনের প্রতি উদ্দীপনা থাকলে আপনার জেগে ওঠার জন্য অ্যালার্মের প্রয়োজন হবেনা।
ভবিতব্য এবং স্বইচ্ছা – এই দু’ টির সংমিশ্রণেই জীবন । বৃষ্টি হ’ল নিয়তি, আপনি তাতে ভিজবেন কিনা সেটি আপনার ইচ্ছা।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর
শয়ন করার একটি সুনির্দিষ্ট সময়ের অনুসরণ করুন
দিনের শেষে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিজেকে যত্ন করুন, এটি আপনাকে শান্তি দেবে এবং সকালে আপনাকে স্ফূর্তিতে ভরিয়ে রাখবে। গভীর নিদ্রার জন্য বাতি নেভানোর আগে ধারাবাহিক ভাবে একটি সময়সূচি অনুসরণ করুন, নিজেকে যত্ন করার অভ্যাস করুন, হালকা খাদ্য গ্রহণ করুন, ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করুন, ধ্যান করুন অথবা বই পড়ুন। আপনি যখন প্রতিদিন এই সময়সূচি অনুসরণ করবেন তখন শোবার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের অভ্যাস গড়ে তুলবেন, যেটি আপনাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম প্রদান করবে, সকালে তরতাজা এবং ভরপুর স্ফূর্তি নিয়ে আপনি জেগে উঠবেন।
আলো নিয়ন্ত্রণ করুন
গভীর ঘুমের জন্য শোবার আগে আপনাকে অবশ্যই ঘরের আলোর উজ্জ্বলতা কমাতে হবে। বিছানায় যাওয়ার এক ঘন্টা পূর্বে ফোন এবং ট্যাবলেটের ব্যবহার বন্ধ রাখা সমীচীন, কারণ এই বৈদ্যুতিন যন্ত্রগুলির বিকিরণ আপনাকে জাগিয়ে রাখতে পারে। সকালে ওঠার সাথে সাথেই এগুলির ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। এটি আপনার সারাদিনের উৎসাহকে নষ্ট করে দিতে পারে এবং কয়েক মিনিটের পরিবর্তে কয়েক ঘণ্টা আপনাকে বিছানায় ফেলে রাখতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম কয়েকটি ঘন্টা আপনি যদি প্রয়োজনীয় কাজে অতিবাহিত করেন, মানসিক ভাবে তা আপনাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করবে এবং সমস্ত দিনের কাজে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে। অ্যালার্ম ছাড়া জেগে ওঠার জন্য আপনাকে একটু অভ্যাস করতে হবে। কিন্তু একবার আপনি অভ্যস্ত হয়ে উঠলে, পরবর্তীতে আপনার আর কখনো এটির প্রয়োজন হবে না।
মূল্যায়ন করাটাই চাবিকাঠি
জাঁকজমকপূর্ণ এবং নির্ভরশীল জগতে, বাইরের ঘটনার দ্বারা প্রবাহিত না হয়ে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে চলাটা সহজ নয়। তথাপি নিজের মূল্যায়ন করাটাই এখানে প্রয়োজন, যেটি আপনাকে প্রতিটি মুহূর্তে উন্নত করবে। বিষয়টি এই নয় যে আপনি কিভাবে নিজেকে অ্যালার্ম ছাড়া উঠতে সাহায্য করবেন, প্রধান বিষয়টি হ’ল বাইরের পরিবেশের নির্দেশ ছাড়া কিভাবে স্বাভাবিক নিয়মে কোন কিছু করা যায়! কার উপর ক্ষমতাকে উপস্থাপন করতে হবে সেটি আপনাকেই স্থির করতে হবে, কারণ আপনি যেটিকে পছন্দ করবেন সেটির উপরই নির্ভর করবে আপনার জীবন আপনি কেমন আশা করেন।











