ভয়কে একটি নেতিবাচক অনুভূতি হিসেবে দেখা হলেও কখনও কখনও তা নিয়ে যায় ইতিবাচক ফলাফলের দিকে। এটি একটি আদিম প্রবৃত্তি যা জীবনকে রক্ষা করে। ভয় থাকাটা খাবারে লবণের মতো হওয়া উচিত। এটি কার্যকর, কিন্তু অতিরিক্ত ভয় আমাদেরকে একটি খোলসের মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
তবে ভয় দূর করার চেষ্টা করতে নেই। ধ্যান করো। জেনে রেখো যে তুমি কেউ নও বা তুমি বিশেষ কারোর।
ভয়ের সম্পূর্ণ বিপরীতে আছে ভালোবাসা। ভয় তারই পরিপূরক। এটা হল উল্টো করে দেওয়া ভালোবাসা। ভয় হল বিকৃত ভালোবাসা। ভালোবাসা দিয়ে যা কিছু ব্যাখ্যা করা যায়, সেগুলোকে ভয় দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি শিশু তার মা কে আঁকড়ে থাকে।সেই আঁকড়ে থাকার কারণ ভালোবাসাও হতে পারে বা ভয়ও হতে পারে।
ভয় হলো অতীতের একটি ছাপ যা বর্তমানের ভবিষ্যতের উপর প্রতিফলিত হয়। যখন মানুষ ভয়কে অস্বীকার করে, তখন তারা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। যখন তারা ভয়কে চিনতে পারে এবং গ্রহণ করে, তখন তারা এর বাইরে চলে যায় এবং তা থেকে মুক্ত হয়।
সম্পূর্ণ ভয়ের অভাব কেবল চরম বিশৃঙ্খলা বা চরম শৃঙ্খলার মধ্যেই সম্ভব। একজন সাধু বা একজন মূর্খের কোনও ভয় থাকে না। কিন্তু এর মাঝখানে সর্বত্রই ভয় রয়েছে। পৃথিবীতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ভয় অপরিহার্য।
ভয় কি?
প্রতিটি বীজের চারপাশে একটি খোলস থাকে। সেই খোলসটি থাকে বীজকে রক্ষা করার জন্য , কিন্তু যখন বীজকে জলে ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন একটি পর্যায়ে আবরণটি ফেটে যায় এবং অঙ্কুরটি বেরিয়ে আসে। একইভাবে, জীবনকে রক্ষা করার জন্য ভয় হল জীবনের চারপাশে একটি প্রক্রিয়া। একই সাথে, এটি থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় রয়েছে। ভয় তখন আসে যখন একটি শিশু স্বাধীন হতে শুরু করে এবং যখন মন বা বুদ্ধি পরিপক্ক হয় তখন ভয় অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি পরিণত বুদ্ধির কোন ভয় থাকে না।
ভয় যেকোনো কিছুর সাথেই যুক্ত থাকতে পারে। এটি সম্মান হারানো এবং জীবন হারানোর সাথে যুক্ত হতে পারে বা এটি হতে পারে রোগের ভয় বা স্ত্রী, সন্তান, বা পিতামাতা হারানোর ভয় বা অর্থ হারানোর ভয় — এই সবই সম্ভব।
তুমি সেই ভয়কে বিভিন্ন জিনিসের উপর ঝুলিয়ে রাখছো, যা ভয়কে ঝুলিয়ে রাখার জন্য কেবল একটি আংটা। তুমি কীভাবে ভয়কে জয় করবে?করবে জ্ঞানের মাধ্যমে – ভয়ের প্রকৃতি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে। যখন ভালোবাসা থাকে আর সেই ভালোবাসা উল্টে যায় তখন তা ভয়ে পরিণত হয়। ঘৃণার জন্ম হয় ভালোবাসা থেকেই। তাই ভালোবাসা বিকৃত হলে অন্যান্য আবেগের রূপ নেয়। নিষ্ঠা, বিশ্বাস, ধ্যান এবং প্রার্থনা হলো ভয়কে ভালোবাসায় রূপান্তরিত করার উপায়।
যখন তুমি ভয় অনুভব করবে, তখন জেনে রাখো যে সেই স্তরেও তোমারও ভালোবাসার ক্ষমতা আছে। যখন তুমি প্রেমে পড়বে বা প্রেমে উত্তীর্ণ হবে, তখন তোমার ভয় বিলীন হয়ে যাবে। ভয় ভালোবাসার আরেকটি দিক ছাড়া আর কিছুই নয়।
ভয়ের কিছু উপকারিতা আছে
মৃত্যুর ভয় জীবনকে রক্ষা করে। অন্যায়ের ভয় ন্যায়কে রক্ষা করে। অসুস্থতার ভয় স্বাস্থ্যবান করে তোলে।
দুর্দশার ভয় মানুষকে ধার্মিক রাখে। একটি শিশুর মনে সামান্য একটু ভয় থাকে ।তাই সে হাঁটার সময় সজাগ এবং সতর্ক থাকে। সবকিছুকেই সচল রাখার জন্য একটু ভয় জরুরি।
প্রকৃতি সকল জীবের গঠনের ভেতরে কিছু পরিমাণ ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে ।এই ভয় জীবনকে রক্ষা করে, নিজেকে সংরক্ষিত রাখে।
খাবারে লবণের মতো, সামান্য ভয় মানুষের সৎ ,ন্যায়নিষ্ঠ হওয়ার জন্যে অপরিহার্য। কাউকে আঘাত করার ভয় তোমাকে আরও সচেতন করে তোলে। ব্যর্থতার ভয় আরও প্রাণবন্ত এবং উদ্যমী করে তোলে। ভয় তোমাকে অসতর্কতা থেকে সতর্কতার দিকে নিয়ে যায়। ভয় অসংবেদনশীল থেকে সংবেদনশীল করে তোলে। ভয় জড়তা থেকে সজাগতার দিকে এগিয়ে দেয়।
প্রকৃতি সকল জীবের গঠনের ভেতরেই কিছু পরিমাণ ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এই ভয় জীবনকে রক্ষা করে, নিজেকে সংরক্ষিত রাখে।
– গুরুদেব শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর
ভয়ের সম্পূর্ণ অভাব ধ্বংসাত্মক প্রবণতার দিকে পরিচালিত করতে পারে — বিকৃত অহংকার কোন ভয় জানে না। প্রসারিত চেতনাও ভয় কাকে বলে,জানে না! অহংবোধ ভয়কে প্রত্যাখ্যান করে এবং একটি বিঘ্নকারী উপায়ে চলে, জ্ঞানী ব্যক্তি ভয়কে স্বীকার করে এবং ঈশ্বরের আশ্রয় নেয়।
যখন তুমি প্রেমে পড়ো, যখন তুমি আত্মসমর্পণ করো, তখন কোন ভয় থাকে না। অহংকারও কোন ভয় জানে না।
কিন্তু এই দুই ধরণের নির্ভীক অবস্থার মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। ভয় তোমাকে সৎ,ন্যায়নিষ্ঠ করে তোলে; ভয় আত্মসমর্পণের কাছাকাছি নিয়ে যায়, ভয় তোমাকে সঠিক পথে রাখে; এটি ধ্বংসাত্মক হতে বাধা দেয়। ভয়ের কারণেই পৃথিবীতে শান্তি ও আইন বজায় থাকে। একটি নবজাত শিশু কোন ভয় জানে না এবং সে সম্পূর্ণরূপে তার মায়ের উপর নির্ভর করে। শিশু, বিড়ালছানা বা পাখি যাই হোক না কেন, যখন তারা স্বাধীন হতে শুরু করে তখন তারা ভয় অনুভব করে, যার ফলে তারা তাদের মায়ের কাছে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য এটি আমাদের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে অন্তর্নিহিত। তাই, ভয়ের উদ্দেশ্য হল তোমাকে উৎসের কাছে ফিরিয়ে আনা!
দশটি ভয় যা আমাদের গ্রাস করতে পারে
- প্রত্যাখ্যানের ভয়
- বাধ্যবাধকতার ভয়
- দায়িত্বের ভয়
- অজানার ভয়
- ব্যর্থতার ভয়
- পরিত্যক্ত হওয়ার ভয়
- সত্যের মুখোমুখি হতে ভয়
- বিচ্ছেদের ভয়
- মতামত এবং অপমানের ভয়
- পর্যাপ্ত না থাকার ভয়
ভয়ের প্রতিষেধক – সেবা ও একাত্মতা
ভয়ের প্রতিষেধক হলো ভালোবাসা এবং সেবা। যদি তুমি নিজেকে কোন সেবায় ব্যস্ত রাখো, তাহলে কোন কিছু নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? এটা একই প্রাণশক্তি যা ভয়, ঘৃণা বা ভালোবাসা হিসেবে প্রকাশ পায়। যদি তুমি এই শক্তিকে ভালোবাসার দিকে পরিচালিত করো, তাহলে তা ভয় বা ঘৃণা হিসেবে প্রকাশ পাবে না। তাই, ব্যস্ত থাকা, নিঃস্বার্থ সেবায় সক্রিয় থাকা ভয়কে জয় করতে সাহায্য করবে।
বিচ্ছিন্নতা ভয় নিয়ে আসে। যদি একাত্মতা থাকে, তাহলে কোন ভয় থাকে না।
– গুরুদেব শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর
তুমি অনন্তের সাথে সংযুক্ত, এই জ্ঞানের অভাব থাকলে ভয়ের উদ্ভব হয়। ‘আমি অনন্তের অংশ’, এই কথাটা ভুলে গেলে মনে ভয় আসে।
তোমার অস্তিত্ব সর্বদা থাকবে কারণ তুমি সমুদ্রের সাথে সংযুক্ত। একটি জলবিন্দু ভয় পায় কারণ সে মনে করে যে সে একা, সে সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত নয়। কিন্তু যখন সেই জলবিন্দুটি সমুদ্রে থাকে, তখন তার কোন ভয় থাকে না। সে কখনই শেষ হয়ে যাবে না কারণ সে সমুদ্রের মধ্যে রয়েছে।
বিচ্ছেদ ভয় নিয়ে আসে। যদি একাত্মতা থাকে, তাহলে কোন ভয় থাকে না। তাহলে কীভাবে ভয় কাটিয়ে ওঠা যায়? একাত্মতা স্মরণ করে।











