এই বিশ্বে আমরা যা কিছু দেখি, সবই শক্তি দিয়ে গঠিত। সূর্যের কিরণ থেকে প্রবহমান নদী, গুঞ্জনরত মোবাইল ফোন থেকে নীরব পেসমেকার—সর্বত্রই শক্তির উপস্থিতি রয়েছে। নিউটনের সূত্র সঠিকভাবেই বলে, শক্তিকে সৃষ্টি করা যায় না বা ধ্বংস করা যায় না, এটি কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু এই শক্তির উৎস কী? জড় ও সচেতন – সবকিছুকে প্রতিটি মুহূর্তে শক্তি বিকিরণ করার ক্ষমতা কোন শক্তি দেয়?
হিন্দুধর্ম অনুযায়ী, দেবী বা পরম মাতৃশক্তিই সমস্ত শক্তির উৎস। এই গুণের কারণেই তাঁকে শক্তি বলা হয়, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ক্ষমতা ।পরম মাতৃশক্তি এই সমগ্র সৃষ্টিকে শক্তি জোগান এবং তা ধারণ ও লালন করেন। আর নবরাত্রি হলো আমাদের অস্তিত্বের জন্য সেই দেবীকে সম্মান ও উপাসনা করার একটি বিশেষ উপলক্ষ।
গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্করের পবিত্র সান্নিধ্যে শক্তিশালী বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, মৌনতা ও গভীর ধ্যানের অপূর্ব অভিজ্ঞতায় নিমগ্ন হোন। বেঙ্গালুরু আশ্রমে আয়োজিত নবরাত্রি 2026 এর (11-20 অক্টোবর) পবিত্র উৎসবে যোগ দিতে এখানে ক্লিক করুন!
যেমন একটি শিশু নয় মাস মায়ের গর্ভে বেড়ে ওঠে, তেমনি নবরাত্রির এই নয়টি রাত আমাদের নিজেদের উৎসে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া এবং নতুন করে প্রাণশক্তি সঞ্চয়ের একটি সুযোগ দেয়। তবে এখানে বিশ্রাম বলতে শুধু শারীরিক কার্যকলাপের অনুপস্থিতি বোঝায় না, মানসিক কার্যকলাপের বিরতিকেও বোঝায়। মনের অবিরাম অস্থিরতা আমাদের শক্তিহীন করে তোলে এবং গভীর বিশ্রামের অবস্থাকে অনুভব করতে দেয় না।
পৃথিবী এমন এক শক্তিতে পরিপূর্ণ, যা আমাদের নিজেদের পুনরুজ্জীবিত ও পুনরায় উদ্দীপ্ত করতে পারে। এই বিশাল শক্তির ভাণ্ডার থেকে শক্তি আহরণ করতে আমাদের শুধু নিজেদের সঠিকভাবে তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিতে হয়। মন যখন স্থির ও শান্ত থাকে, তখন তা চারপাশের পরিবেশ থেকে শক্তি গ্রহণ করে এবং প্রসারিত হয়। এর ফলে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়, মন প্রশান্ত হয় এবং কর্মক্ষমতাও উন্নত হয়। ধ্যান ও উপবাসের মতো আধ্যাত্মিক অনুশীলন আমাদের এই ধরনের মানসিক অবস্থার সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিতে সাহায্য করে।
যদিও ধ্যান ও উপবাস মনকে শান্ত করে এবং নিরন্তর মানসিক অস্থিরতা কমায়, নীরবতাই এই অভিজ্ঞতাকে সত্যিকার অর্থে গভীর ও সমৃদ্ধ করে। গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশংকর বলেন, নীরবতা শুধু আমাদের কথাকে শুদ্ধ করে না, বরং আমাদের দক্ষতাও বিকশিত করে। এছাড়া, নীরবতায় অবস্থান করলে মন স্থির হয় এবং সম্পূর্ণভাবে অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে, ফলে আমরা নিজের অন্তর্জগতে আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারি।
তবে নীরবতা শুধু কথা না বলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আরও গভীর ও বিস্তৃত তাৎপর্য রয়েছে। সংক্ষেপে, নীরবতাকে তিনটি ভিন্ন স্তরে ভাগ করা যায়:
- যখন কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।
- যখন মন চারপাশের বিষয়গুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে সম্পূর্ণভাবে নিজের অন্তরে নিবিষ্ট থাকে।
- যখন সম্পূর্ণ একাত্মতা ও পরিতৃপ্তির অনুভূতি জন্ম নেয়।
প্রথম ধরনের নীরবতায় আমরা কথা না বলে এবং অঙ্গভঙ্গির ব্যবহার এড়িয়ে আমাদের শক্তি সংরক্ষণ করি। দ্বিতীয় ধরনের নীরবতায় আমরা আরও এক ধাপ এগিয়ে ইন্দ্রিয়সুখে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকি। কারণ, যখনই আমরা কোনো ইন্দ্রিয়সুখে মগ্ন হই, তখন মন সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে পুষ্ট করে। তাই মনকে প্রকৃত বিশ্রাম দেওয়ার জন্য ইন্দ্রিয়সুখ থেকে বিরত থাকা হয়। এরও এক ধাপ ঊর্ধ্বে রয়েছে তৃতীয় ধরনের নীরবতা, যেখানে আমাদের আর কোনো কিছুর প্রয়োজন অনুভূত হয় না এবং আমরা চারপাশের সবকিছুর সঙ্গে শান্তি ও পরিতৃপ্তির অবস্থায় থাকি। এই অবস্থায় মন সম্পূর্ণ স্থির হয়ে নিজের উৎসে ফিরে যেতে সক্ষম হয়।
তোমরা মনে করো, উদ্যাপন মানেই হইচই আর নীরবতা মানেই শোক। মানুষ যখন উদ্যাপন করে, তখন প্রচুর শব্দ করে; আর যখন নীরব থাকে, তখন মনে করা হয় তারা শোক পালন করছে। কেউ মারা গেলে অথবা ভয়াবহ কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে মানুষ নীরব থাকে। কিন্তু আমাদের উদ্যাপন সম্পূর্ণ ভিন্ন, আমাদের নীরবতাও সম্পূর্ণ আলাদা। এটি হলো আনন্দময় থেকেও নীরব থাকা। এভাবেই আনন্দ তার গভীরতা লাভ করে এবং প্রকৃত অর্থে নীরবতা আমাদের জীবনে এক প্রভাবশালী শক্তি হয়ে ওঠে। তাই এই নীরবতা দুঃখের নীরবতা নয়, এবং এই উদ্যাপনও কোনো নিছক হালকা আমোদ- উল্লাস নয়। উদ্যাপনের গভীরতা অর্জনের জন্য নীরবতা অপরিহার্য আর নীরবতা তার পূর্ণ মহিমায় প্রকাশিত হওয়ার জন্য উদ্যাপন প্রয়োজন।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশংকর
নবরাত্রি যত এগিয়ে আসছে, ততই সচেতনভাবে যতটা সম্ভব নীরব থাকার চেষ্টা করুন এবং নিজেই এর পার্থক্য অনুভব করুন। যখন পরম মাতৃশক্তিকে সম্মান ও পূজা করা হচ্ছে, তখন নিজেকেও তাঁর প্রকৃত শক্তিতে সিক্ত হওয়ার এবং দেবীর চিরন্তন দিব্য শক্তির এক ঝলক উপলব্ধি করার সুযোগ দিন।











