রাগ

অন্য কারও ভুলের জন্য যে শাস্তি দেওয়া হয়, সেটাই রাগ।

কেউই অস্থির হতে বা রাগ দেখাতে পছন্দ করেননা। আমরা যখন অন্যের ভুল দেখেও সহানুভূতি অনুভব করি না, তখন আমরা তাদের ওপর রাগ করি এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ওপরও রাগ জন্মায়। আমাদের মন, চেতনা এবং আমাদের স্বভাবের বিকৃতির মূল সম্পর্কে আমাদের সামান্য জ্ঞান থাকলে তা এ বিষয়ে সাহায্য করে। আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আমাদের অনেক বড় শিক্ষা দেয়, যা আমরা ভুলে গেছি। শ্বাসের কৌশল ও ধ্যান মনকে শান্ত করতে খুবই কার্যকর। তখন আমরা আমাদের রাগকে “দামি” আর হাসিকে বিনামূল্যে বিতরণ করতে পারি।

রাগ সম্পর্কে আশ্চর্য গোপন কথা

icon

ন্যায়বোধ

রাগের মূল কারণ হলো নিজের ঠিক হওয়ার অনুভূতি। আপনি যদি মনে করেন আপনি ঠিক নন, তাহলে আপনি রাগ করতে পারবেন না। আর যখন দুইজন মানুষ একে অপরের ওপর রাগ করেন, তখন দুজনেই মনে করেন তারা ঠিক। আলাদা করে কথা বললে দেখবেন, দুজনই নিজের দিক থেকে ঠিক। অর্থাৎ “ঠিক হওয়া” আসলে এক ধরনের ধারণা।

icon

গভীর ইচ্ছা

দ্বিতীয় কারণ হলো যখন আপনার গভীর কোনো ইচ্ছা পূরণ হয় না, তখন হতাশা আসে। আর সেই হতাশাই রাগের জন্ম দেয়।

icon

ক্লান্তি

তৃতীয় কারণ হলো শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। যখন আপনি চাপ থেকে মুক্ত হতে পারেন না, তখন তা রাগ হিসেবে প্রকাশ পায়।

icon

নিখুঁত হবার আকাঙ্ক্ষা

চতুর্থ কারণ হলো সবকিছু নিখুঁত হওয়ার প্রত্যাশা। আপনি আশা করেন সবাই আপনার ধারণা অনুযায়ী নিখুঁত হোক — যা কখনোই সম্ভব নয়। এতে অবশ্যই আপনার ভিতরে রাগ তৈরি হয়।

সম্পর্কিত কর্মসূচি

রাগকে দামি করুন, হাসিকে বিনামূল্যে বিতরণ করুন!

রাগ আমাদের প্রকৃত স্বভাবের বিকৃতি, যা আমাদের অন্তরের আলোকে পুরোপুরি প্রকাশ পেতে দেয় না। আপনি নিজেকে শতবার মনে করাতে পারেন যে রাগ করা উচিত নয়, কিন্তু যখন সেই অনুভূতি আসে, তখন আপনি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। এটি ঝড়ের মতো হঠাৎ এসে যায়।

— গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর

রাগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়

exercises

ব্যায়াম

যারা খুব বেশি শারীরিক কাজকর্ম করেন না, তারা প্রায়ই বেশি রেগে যান। শরীরের ভেতরে জমে থাকা সেই “রজঃ’ বেরোতে পারে না, তাই তা মাথায় আটকে থাকে। তাই দীর্ঘ হাঁটাহাঁটি করুন, ট্রেডমিলে দৌড়ান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন। যোগব্যায়াম খুব ভালো বিকল্প। সূর্য নমস্কার অনুশীলন করুন। এতে শরীর ক্লান্ত হবে এবং রাগ করার মতো শক্তিই থাকবে না।

Meditation - Smiling Ekta meditating on the pathway in Ashram

শ্বাস-প্রশ্বাস ও ধ্যান

গভীর শ্বাস নিন এবং নিজেকে শান্ত করুন। নিয়মিত প্রাণায়াম ও ধ্যানের অভ্যাস রাগকে জয় করার শক্তি দেয়।

Children and teens - Happy girl smiling with open arms looking at the sky

দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করুন

এই পৃথিবী কখনোই পুরোপুরি নিখুঁত হতে পারে না। তাই নিজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করুন এবং ত্রুটি ও অপূর্ণতার জন্য কিছু জায়গা রাখুন। শুধু “আমি-ই ঠিক” - এই ধারণায় আটকে থাকবেন না। অন্যদের মতামতকেও গ্রহণ করুন। আপনি সবাইকে নিজের মতো করে বদলাতে পারবেন না। অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবেই , আর যখন ঘটবে তখন এগিয়ে যাওয়ার সাহস ও শক্তি রাখতে হবে।

মানুষ, পরিস্থিতি ও বস্তুকে যেমন আছে তেমনভাবেই গ্রহণ করুন।

healthy food habits to maintain wellness

খাবারের প্রতি খেয়াল রাখুন

যদি আপনি “পিত্ত” প্রকৃতির হন, তাহলে রাগ বেশি হতে পারে। সূর্য ওঠার দুই ঘণ্টার মধ্যে কিছু খাবার খাওয়া জরুরি। না খেলে পিত্ত বেড়ে যায়। তাই সকালের জলখাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খুব বেশি ঝাল, টাবাস্কো সস বা চিলি সস এড়িয়ে চলুন। দীর্ঘ সময় উপোস করবেন না এবং সময়মতো খাবার খান। কারণ খাবার দেহের ‘ অগ্নিতত্ত্ব ‘ বাড়িয়ে দিতে পারে। পিত্তের ভারসাম্য নষ্ট হলে আপনি সবসময় উত্তেজিত অবস্থায় থাকবেন।পিত্ত ভারসাম্যে থাকলে আপনার কখনও অকারণে রাগ হবে না।

যখন অন্য কেউ রেগে যায় তখন কী করবেন?

যখন কেউ রেগে যায়, তখন আপনিও একসঙ্গে রেগে যাবেন না। কেউ যদি চিৎকার করে, সেটি তাদের সময় - তাদেরকে সেই সময় দিন। আপনি দর্শকের মতো থাকুন, অংশগ্রহণকারী হবেন না। সমস্যা তখনই হয়, যখন সবাই অভিনেতা হয়ে যায়, দর্শক কেউ থাকে না। তাই পালা করে রাগ করুন। মজা করুন। রসিকতা হলো রাগের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক। মন স্থির থাকলে রসিকতা নিজে থেকেই আসে।

এছাড়া কেউ যদি অকারণে খুব রেগে যায়, বুঝবেন তার পিত্ত বেড়েছে। তাকে শান্ত হতে সাহায্য করুন। আইসক্রিম, দুধ বা ঠান্ডা প্রকৃতির কিছু খাবার দিন — এগুলো পিত্ত কমাতে সাহায্য করে।

আমার কি কখনোই রাগ করা উচিত নয়?

রাগ নিজে খারাপ নয়। যদি তা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই চলে যায়, তাহলে ঠিক আছে। রাগ এমন হওয়া উচিত, যেমন জলের ওপর দাগ টানলে মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। মাঝে মাঝে রাগ এলে নিজেকে দোষ দিতে শুরু করবেন না। আধ্যাত্মিক পথে সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয়গুলোর একটি হলো নিজেকে দোষারোপ করা। রাগ প্রকাশ করা ভুল নয়, কিন্তু নিজের রাগ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা আপনারই ক্ষতি করে। কখনও কখনও ইচ্ছাকৃতভাবেও রাগ দেখানো যায়। যেমন - সন্তান বিপদে পড়লে কোনো মা তাকে বকতে বা তার সঙ্গে কঠোর আচরণ করতে পারেন।

রাগ কখনও কখনও চ্যালেঞ্জ গ্রহণের শক্তিও দেয় — যা হয়তো আপনি অন্যভাবে করতেন না। এইভাবে এটি এক ধরনের প্রেরণাও হতে পারে। তবে এর মধ্যে তিক্ততা থাকা উচিত নয়। যদি রাগের কারণে মনে তিক্ততা জমে যায়, তা আপনাকে ভেতর থেকে গ্রাস করবে। রাগ আগুনের মতো — এটি আপনাকে উষ্ণতাও দিতে পারে, আবার পুড়িয়েও দিতে পারে। রাগ করার পরিণতি ভেবে দেখুন।

রাগের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা বলা কথায় কি আপনি খুশি থাকেন? সাধারণত না, কারণ তখন আপনি সম্পূর্ণ সচেতনতা হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু যদি আপনি সম্পূর্ণ সচেতন থেকে রাগ প্রকাশ করেন, তাহলে কোনও অসুবিধা নেই।

এমন অবস্থায় পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে, যখন রাগ আপনাকে স্পর্শই করবে না। ততদিন রাগ নানা মাত্রা ও তীব্রতায় আসতেই থাকবে। সেই সময় পর্যন্ত নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যান - সুদর্শন ক্রিয়া , প্রাণায়াম ও ধ্যান আপনাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করবে।