আপনি নিশ্চয়ই ধ্যান (Meditation) ও প্রণায়াম সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছেন। আপনি কি জানেন, এই প্রাচীন বিজ্ঞানটি ভারতবর্ষে প্রায় 5000 থেকে 8000 বছর ধরে প্রচলিত? এই বিজ্ঞানটি আয়ুর্বেদের (পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসা বিজ্ঞান) সঙ্গে মিলিত হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই প্রাচীন বিজ্ঞানের উপকার পেয়েছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিজ্ঞানসম্মত ভাবে এর নথিভুক্তকরণ হয় নি। বর্তমানে ভারত সরকার একটি আয়ুর্বেদ গবেষণা বিভাগ গঠন করছে।
ধ্যান ও প্রণায়ামের কথায় ফিরে আসি। মজার বিষয় হলো, আপনি যদি একটি শিশুকে ভালো করে লক্ষ্য করেন, তবে দেখবেন—জন্ম থেকে প্রায় তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা প্রায় সব যোগাসনই স্বাভাবিকভাবে করে। এর জন্য যোগশিক্ষকের প্রয়োজন নেই, শুধু গভীর পর্যবেক্ষণ দরকার।
আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, শিশুরা ভুজঙ্গাসন করে-পেটের ওপর শুয়ে ঘাড় তোলে। আবার তারা নৌকাসনও করে-চিত হয়ে শুয়ে হাত ও পা মাটি থেকে তুলে রাখে। তিন বছর বয়সের আগেই তারা প্রায় সব যোগাসনই করে ফেলে। আমাদের শুধু সেগুলো লক্ষ্য করা দরকার।
এছাড়া শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনও আলাদা। তারা পেট থেকে শ্বাস নেয়। প্রত্যেকটি আবেগের সঙ্গে শ্বাসের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ জড়িত। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন, আপনি যখন আনন্দিত থাকেন তখন শ্বাসের ছন্দ একরকম হয়, আর দুঃখে থাকলে তা অন্যরকম হয়। শ্বাসের তাপমাত্রা, গতি, দৈর্ঘ্য ও গভীরতা তখন বদলে যায়। এ (নাটকের ক্লাসেও শেখানো হয়-শ্বাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে কীভাবে বিভিন্ন আবেগ প্রকাশ করতে হয়।)তাই এটা বুঝতে হবে যে আমাদের আবেগ, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
যোগ মুদ্রা করবার পদ্ধতি আর এর উপকারিতা
যখন একটি শিশুর জন্ম হয়, তখন সে একটি নির্দিষ্ট মুদ্রায় জন্মায়, যাকে যোগশাস্ত্রে বলা হয় আদি মুদ্রা (Aadi Mudra)-যেখানে বড় আঙুল তালুর ভেতরে ঢোকানো থাকে এবং বাকি আঙুলগুলো মুঠো করে ধরা থাকে।
শিশুরা ঘুমানোর সময় প্রায়ই চিন মুদ্রা -(বড় আঙুল ও তর্জনীর ডগা একসঙ্গে লাগানো, বাকি আঙুল সোজা) এবং চিন্ময়ী মুদ্রা -(বড় আঙুল ও তর্জনীর ডগা একসঙ্গে লাগানো, বাকি আঙুল তালুর ভেতরের দিকে ভাঁজ করা) করে থাকে।
আবার যখন তারা বুড়ো আঙুল চোষে, তখন তারা মেরুদণ্ড মুদ্রা করে—যেখানে বুড়ো আঙুল উপরের দিকে থাকে এবং বাকি আঙুলগুলো ভাঁজ করা থাকে।
একটি মুদ্রা (হাতের ভঙ্গি) মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ ও শরীরের কিছু বিশেষ অংশকে উদ্দীপিত করে। তাই শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মুদ্রা করে থাকে।
আপনি যদি লক্ষ্য করেন, যখন কেউ ঠান্ডা অনুভব করে, তখন স্বাভাবিক প্রবণতা হয় বগলের নিচে বুড়ো আঙুল লুকিয়ে রাখা, যাতে বড় আঙুল গরম থাকে। যোগশাস্ত্র অনুযায়ী বুড়ো আঙুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, বুড়ো আঙুল গরম থাকলে পুরো শরীরই উষ্ণ থাকে।
যোগে আরও বলা হয়, আমাদের আঙুলের ডগাগুলো শক্তির কেন্দ্র। সমগ্র শরীরে মোট 108টি চক্র রয়েছে, যার মধ্যে 12টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তার মধ্যেও ৭টি সবচেয়ে প্রধান। এই কেন্দ্রগুলোর ওপর মনোযোগ দিলে সেগুলো সক্রিয় ও সুষম হয়।
1. চিন মুদ্রা
- বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর ডগা হালকাভাবে একসঙ্গে স্পর্শ করান এবং বাকি তিনটি আঙুল সামনে সোজা রাখুন।
- বুড়ো আঙুল ও তর্জনী শুধু আলতোভাবে ছুঁয়ে থাকবে, কোনো চাপ প্রয়োগ করবেন না।
- তিনটি প্রসারিত আঙুল যতটা সম্ভব সোজা রাখুন।
- এরপর হাত দুটি উরুর ওপর রাখুন, তালু আকাশের দিকে মুখ করে থাকবে।
- এবার শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি এবং তার প্রভাব লক্ষ্য করুন।
চিন মুদ্রার উপকারিতা
- এটি স্মৃতিশক্তি ও মনোসংযোগের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
- এটি ঘুমের ধরণকে উন্নত করে।
- এটি শরীরে এনার্জী অনেক বাড়িয়ে তোলে।
- এটি কোমরের নিচের অংশের ব্যথা কমিয়ে দেয়।

2. চিন্ময়ী মুদ্রা
- এই মুদ্রায় বড় আঙুল ও তর্জনী একটি বৃত্ত তৈরি করে এবং বাকি তিনটি আঙুল তালুর ভেতরের দিকে ভাঁজ করা থাকে।
- এরপর হাত দুটি উরুর ওপর রাখুন, তালু উপরের দিকে থাকবে, এবং গভীর ও আরামদায়ক উজ্জয়ী শ্বাস নিন।
- আবারও শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রবাহ ও তার প্রভাব লক্ষ্য করুন।
চিন্ময়ী মুদ্রার উপকারিতা
- শরীরে এনার্জীর প্রবাহকে উন্নত করে।
- হজম প্রক্রিয়াকে ভাল করে তোলে।

3. আদি মুদ্রা
- আদি মুদ্রায় বুড়ো আঙুলটি কনিষ্ঠ আঙুলের গোড়ায় রাখুন এবং বাকি আঙুলগুলো বুড়ো আঙুলের ওপর ভাঁজ করে হালকা মুঠো তৈরি করুন।
- এক্ষেত্রেও তালু উপরের দিকে রেখে হাত উরুর ওপর রাখুন এবং একইভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে ও ছাড়তে থাকুন।
আদি মুদ্রার উপকারিতা
- স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে।
- নাক ডাকার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে।
- মাথায় অক্সিজেনের প্রবাহ বৃদ্ধি করে।
- ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায়।

প্রায় এক বছর আগে নিউইয়র্কের বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করেছেন যে, কেউ যদি প্রতিদিন নিয়মিত 20 মিনিট করে ৮ সপ্তাহ ধ্যান করেন, তাহলে মস্তিষ্কে গঠনগত পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বৃদ্ধি পায়। এটি সত্যিই বিস্ময়কর। আমরা প্রাচীনকাল থেকেই এটি জানি এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বুঝে এসেছি। ধ্যানের মাধ্যমে মানুষের মানসিকতা বদলে যায়। তারা দিনের যেকোনো সময় নিজেকে সতেজ অনুভব করে। এখন বিজ্ঞানও এই বিষয়টি স্বীকৃতি দিয়েছে।বলা হয়, “বিস্ময় যোগ ভূমিকা” অর্থাৎ, যোগের সূচনা হয় বিস্ময় বা আশ্চর্য হওয়া দিয়ে। যখন আমরা চারপাশের জিনিসগুলোকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে দেখতে শিখি, তখনই যোগ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করে।
আপনি যদি লক্ষ্য করেন, যখন কেউ ঠান্ডা অনুভব করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে বগলের নিচে বড় আঙুল কিয়ে রাখে, যাতে বড় আঙুল উষ্ণ থাকে। আসলে যোগশাস্ত্রে বড় আঙুল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, বুড়ো আঙুল গরম থাকলে পুরো শরীর গরম থাকে। যোগে আরও বলা হয়, আমাদের আঙুলের ডগাগুলো শক্তির কেন্দ্র।
আসনের উপকারিতা হলো-এর মাধ্যমে শরীর সুস্থ ও শক্তিশালী হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস কম্পনমুক্ত ও স্থির হয়, মন প্রফুল্ল হয়, বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয়, চেতনার স্তরে আত্মোপলব্ধি ঘটে এবং অন্তর্দৃষ্টি (intuition) বৃদ্ধি পায়। এর উপকারিতা অসংখ্য। তাই প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও আমাদের যোগ ও ধ্যান করা উচিত। যোগ হলো যোগাযোগের একটি দক্ষতা-মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের একটি কৌশল। যোগ ও ধ্যান সম্পর্কে আরও জানতে পারেন দি আর্ট অফ লিভিং পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে, যেমন’ হ্যাপিনেস প্রোগ্রাম’। আমাদের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে একটি বিনামূল্যের ধ্যান সেশনে এখনই নাম লেখাতে পারেন। যোগাভ্যাস শরীর ও মনের বিকাশে সহায়ক হলেও এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। প্রশিক্ষিত যোগ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যোগ অভ্যাস করুন।শারীরিক অসুস্থতা থাকলে ডাক্তারের বা শ্রীশ্রী যোগ শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে যোগব্যায়াম করুন।
যোগ মুদ্রা সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
● বুড়ো আঙুল → অগ্নি (আগুন)
● তর্জনী → বায়ু (হাওয়া)
● মধ্যমা → আকাশ
● অনামিকা → পৃথিবী
● কনিষ্ঠা → জল
শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলের সঙ্গে মুদ্রা মিলিত হলে শরীরের প্রাণশক্তির প্রবাহ উদ্দীপিত হয়। আঙুলের ডগায় করা মুদ্রা মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়বিক ছকের সঙ্গে সূক্ষ্ম সংযোগ তৈরি করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, গ্রন্থি, শিরা ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
● রক্তে অক্সিজেনের সঞ্চালন উন্নত করে
● পিটুইটারি ও অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির ভারসাম্য রক্ষা করে
● অন্তর্দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি করে
● বাহু ও কব্জির নমনীয়তা বাড়ায়
● আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে
● স্মৃতিশক্তি উদ্দীপিত করে
● চিন মুদ্রা → মনোযোগ বৃদ্ধি করার জন্য
● চিন্ময়ী মুদ্রা → হজমের উন্নতির জন্য
● আদি মুদ্রা → নাক ডাকা কমাতে ও স্নায়ুতন্ত্র শিথিল করতে
● ব্রহ্ম মুদ্রা → ক্লান্তি কমাতে
● অঞ্জলি মুদ্রা → ইতিবাচক চিন্তা গড়ে তুলতে
● প্রাণ মুদ্রা → আরোগ্য ও সুস্থতার জন্য
● বরুণ মুদ্রা →ভাবের আদান প্রদানকে স্পষ্ট করবার জন্য
● আপান বায়ু মুদ্রা → মানসিক চাপ কমাতে
● সূর্য মুদ্রা → বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিসম)উন্নত করতে
● অশ্বিনী মুদ্রা → কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে
● হাকিনী মুদ্রা → মনের একাগ্রতার জন্য
● প্রাণ মুদ্রা → প্রাণশক্তি ও উদ্যম বাড়ায়
● গণেশ মুদ্রা → বাধা দূর করে
● অঞ্জলি মুদ্রা → শান্তি আনে
● কালী মুদ্রা → কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে শক্তি দেয়
● লিঙ্গ মুদ্রা → ফুসফুসকে শক্তিশালী করে ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা দূর করে
● মস্তিষ্ক যে সংকেত গ্রহণ করে, তা শরীর, মন ও আবেগের ভেতরে প্রাণশক্তির বিন্যাসে পরিবর্তন আনে।











