সূর্য নমস্কার কী?
সূর্য নমস্কার বা সান স্যালুটেশন হলো ১২টি শক্তিশালী যোগাসনের একটি ধারাবাহিক অনুশীলন। এটি শুধু একটি চমৎকার কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম নয়, শরীর ও মনের উপর এটি অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সূর্য নমস্কারের ধাপগুলো খালি পেটে ভোরবেলায় করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সূর্য নমস্কারের প্রতিটি রাউন্ডে দুটি সেট থাকে এবং প্রতিটি সেটে ১২টি যোগাসন অন্তর্ভুক্ত থাকে। সূর্য নমস্কার করার বিভিন্ন পদ্ধতি থাকতে পারে, তবে সর্বোত্তম ফলের জন্য একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বেছে নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করাই ভালো।
ভালো স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সূর্য নমস্কার আমাদের জীবনের উৎস সূর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুন্দর মাধ্যম।
সূর্য নমস্কারের ধাপসমূহ
ধাপ 1: প্রণামাসন

ম্যাটের একদম সামনের দিকে দাঁড়ান। দুই পা একসাথে রাখুন এবং শরীরের ওজন সমানভাবে দুই পায়ে রাখুন। বুক প্রসারিত করুন ও কাঁধ ঢিলা রাখুন। শ্বাস নিতে নিতে দুই হাত পাশ দিয়ে উপরে তুলুন এবং শ্বাস ছাড়ার সময় বুকের সামনে দুই হাতের তালু জোড়া করে প্রণাম ভঙ্গিতে আনুন।
হ্যাপিনেস প্রোগ্রাম
সুদর্শন ক্রিয়া মানুষের নেতিবাচক আবেগকে অনেক ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। আপনি যদি প্রতিদিন এটি অনুশীলন করেন, তাহলে আপনি আরও ধীর,স্থির ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে উঠবেন।
ধাপ 2: হস্তউত্তানাসন

শ্বাস নিতে নিতে দুই হাত উপরে ও পেছনের দিকে তুলুন। বাহু যেন কানের কাছাকাছি থাকে। এই আসনে গোড়ালি থেকে শুরু করে হাতের আঙুলের ডগা পর্যন্ত পুরো শরীরকে উপরের দিকে ভালোভাবে প্রসারিত করার চেষ্টা করুন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
সামান্যভাবে পেলভিস সামনে দিকে ঠেলে দিতে পারেন। খেয়াল রাখবেন, পেছনের দিকে বেশি বাঁকানোর চেষ্টা না করে আঙুলের ডগা দিয়ে উপরের দিকে প্রসারিত হওয়ার চেষ্টা করবেন।
ধাপ 3: হস্তপদাসন

শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কোমর থেকে সামনের দিকে ঝুঁকুন এবং মেরুদণ্ড সোজা রাখুন। সম্পূর্ণভাবে শ্বাস ছাড়ার পর দুই হাত পায়ের পাশে মেঝেতে রাখুন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
প্রয়োজনে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করতে পারেন, যাতে হাতের তালু মেঝেতে রাখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে হাঁটু সোজা করার চেষ্টা করুন। এই অবস্থায় হাত দুটি স্থির রাখাই ভালো এবং এই ধাপটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাত না সরানো উচিত।
ধাপ 4: অশ্ব সঞ্চালনাসন

শ্বাস নিতে নিতে ডান পা যতটা সম্ভব পেছনের দিকে নিয়ে যান। ডান হাঁটু মেঝেতে রাখুন এবং মাথা তুলে সামনে দিকে তাকান।
টিপস: এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার জন্য
খেয়াল রাখবেন, বাম পা যেন ঠিক দুই হাতের মাঝখানে থাকে।
ধাপ 5: দণ্ডাসন

শ্বাস নিতে নিতে বাম পা পেছনের দিকে নিয়ে যান এবং পুরো শরীরকে একটি সোজা রেখার মতো রাখুন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
হাত দুটি মেঝের সঙ্গে লম্বভাবে রাখুন।
ধাপ 6: অষ্টাঙ্গ নমস্কার

ধীরে ধীরে হাঁটু মেঝেতে নামান এবং শ্বাস ছাড়ুন। কোমরের অংশ সামান্য পেছনের দিকে নিয়ে গিয়ে শরীর যতটা সম্ভব সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করুন। বুক ও থুতনি মেঝেতে রাখুন এবং নিতম্ব সামান্য উপরের দিকে তুলুন। এই ভঙ্গিতে শরীরের আটটি অংশ—দুই হাত, দুই পা, দুই হাঁটু, বুক ও থুতনি—মেঝে স্পর্শ করবে।
ধাপ 7: ভুজঙ্গাসন

শরীর সামনে দিকে সরিয়ে বুক তুলুন এবং কেউটে সাপের মত ভঙ্গীতে আসুন। এই ভঙ্গিতে কনুই ভাঁজ করে রাখতে পারেন এবং কাঁধ যেন কানের থেকে দূরে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। মাথা তুলে উপরের দিকে তাকান।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
শ্বাস নিতে নিতে বুককে সামান্য সামনে দিকে ঠেলার চেষ্টা করুন; শ্বাস ছাড়ার সময় নাভির অংশ মেঝের দিকে নামানোর হালকা চেষ্টা করুন। পায়ের আঙুল ভেতরের দিকে ভাঁজ করে রাখুন। নিজের ক্ষমতার মধ্যেই শরীর প্রসারিত করুন, জোর করবেন না।
ধাপ 8: অধোমুখ শ্বনাসন

শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে কোমর ও মেরুদণ্ডের শেষ হাড়টি উপরের দিকে তুলুন এবং শরীরকে উল্টো “V” আকৃতিতে নিয়ে আসুন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
যদি সম্ভব হয়, গোড়ালি মেঝেতে রাখার চেষ্টা করুন এবং মেরুদণ্ডের শেষ হাড়টি উপরের দিকে তুলতে হালকা চেষ্টা করুন, যাতে প্রসারণ আরও গভীর হয়।
ধাপ 9: অশ্ব সঞ্চালনাসন

শ্বাস নিতে নিতে ডান পা সামনে এনে দুই হাতের মাঝখানে রাখুন। বাম হাঁটু মেঝেতে নামান। কোমর নিচের দিকে চাপ দিন এবং মাথা তুলে উপরের দিকে তাকান।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
ডান পা ঠিক দুই হাতের মাঝখানে রাখুন এবং ডান পায়ের পেছনের অংশ যেন মেঝের সঙ্গে লম্বভাবে থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। এই অবস্থায় নিতম্ব ধীরে মেঝের দিকে নামানোর হালকা চেষ্টা করুন, এতে প্রসারণ আরও গভীর হবে।
ধাপ 10: হস্তপদাসন

শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বাম পা সামনে এনে রাখুন। হাতের তালু মেঝেতেই রাখুন। প্রয়োজন হলে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করতে পারেন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
ধীরে ধীরে হাঁটু সোজা করার চেষ্টা করুন এবং সম্ভব হলে নাক হাঁটুর সঙ্গে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করুন। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখুন।
ধাপ 11: হস্তউত্তানাসন

শ্বাস নিতে নিতে মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে সোজা করে উঠুন। দুই হাত উপরের দিকে তুলুন এবং কোমর সামান্য বাইরে ঠেলে হালকা পেছনের দিকে বাঁকুন।
এই যোগাসনটি আরও গভীরভাবে করার টিপস:
খেয়াল রাখবেন, বাহু যেন কানের পাশেই থাকে। এখানে মূল লক্ষ্য হলো উপরের দিকে ভালোভাবে প্রসারিত হওয়া, বেশি পেছনের দিকে বাঁকানো নয়।
ধাপ 12: তড়াসন

শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে প্রথমে শরীর সোজা করুন, তারপর হাত দুটি নিচে নামান। এই অবস্থায় শিথিল হয়ে দাঁড়ান এবং শরীরে যে অনুভূতিগুলো হচ্ছে সেগুলো লক্ষ্য করুন।
এর মাধ্যমে সূর্য নমস্কারের একটি সেট সম্পূর্ণ হয়। পুরো রাউন্ড সম্পূর্ণ করতে একই ধাপগুলো আবার করুন, তবে এবার শুরু করবেন বাম পা পেছনে নিয়ে। ধাপ নম্বর ৪-এ যেমনভাবে পা পেছনে নেওয়া হয়েছিল, ঠিক তেমনই ধাপ নম্বর ৯-এ বাম পা সামনে নিয়ে আসুন। এভাবে করলে সূর্য নমস্কারের একটি সম্পূর্ণ রাউন্ড শেষ হবে।
সূর্য নমস্কার ভিডিও
অনুশীলন 1: আগামী 10 দিন প্রতিদিন 12 রাউন্ড সূর্য নমস্কার করুন। এরপর অন্যান্য যোগাসন অনুশীলন করুন এবং সবশেষে যোগ নিদ্রা দিয়ে বিশ্রাম নিন (গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্করের নির্দেশিত একটি আরামদায়ক ধ্যান)। আপনি অবাক হয়ে দেখবেন, এই সহজ অনুশীলন আপনাকে সারাদিন সুস্থ, আনন্দিত ও শান্ত থাকতে সাহায্য করবে।
সূর্য নমস্কারের উপকারিতা
- হৃদযন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা সুস্থ রাখতে সাহায্য করে
- স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে
- পেশিগুলোকে প্রসারিত, নমনীয় ও দৃঢ় করতে সাহায্য করে
- ওজন নিয়ন্ত্রণ ও ওজন কমানোর জন্য অত্যন্ত কার্যকর
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়
- মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে
- সার্বিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, শরীরকে শক্তিশালী করে এবং মনকে শান্ত রাখে
সূর্য নমস্কার সম্পর্কিত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রণামাসন, হস্তউত্তানাসন, হস্তপাদাসন, অশ্ব সঞ্চালনাসন, দণ্ডাসন, অষ্টাঙ্গ নমস্কার, ভুজঙ্গাসন, অধোমুখ স্বনাসন, অশ্ব সঞ্চালনাসন, হস্তপদাসন, হস্তউত্তানাসন ও তাড়াসন।
ভালোভাবে সূর্য নমস্কার করার মূল চাবিকাঠি হলো প্রতিটি ভঙ্গিতে নিজের 100% মনোযোগ ও প্রচেষ্টা দেওয়া। আরও গভীর অভিজ্ঞতার জন্য চোখ বন্ধ করে ধীর গতিতে অনুশীলন করতে পারেন।
সূর্য নমস্কার শরীরকে রোগমুক্ত ও সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এটি শরীর ও মনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে এবং রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে।
এছাড়াও এটি হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং হৃদযন্ত্রকে শক্তিশালী করে। সূর্য নমস্কার পেটের পেশি, শ্বাসযন্ত্র, লসিকাতন্ত্র, মেরুদণ্ডের স্নায়ু ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গকে সক্রিয় করে।
এই অনুশীলন মেরুদণ্ড, ঘাড়, কাঁধ, বাহু, হাত, কবজি, পিঠ ও পায়ের পেশিগুলোকে মজবুত ও সুগঠিত করে, ফলে শরীর আরও নমনীয় হয়।
মানসিকভাবে এটি শরীর, শ্বাস ও মনের পারস্পরিক সংযোগ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এর ফলে মন শান্ত হয়, সচেতনতা বাড়ে এবং শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া সূর্য নমস্কার ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং ত্বক ও চুলের যত্নেও উপকারী।










