যোগব্যায়াম হলো শারীরিক ভঙ্গি (আসন), শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল (প্রাণায়াম), ধ্যান এবং নৈতিক ধারণার সমন্বয়। যোগের লক্ষ্য হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অর্জন করা এবং অন্তরের শান্তি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির অবস্থায় পৌঁছানো। এই প্রাচীন সামগ্রিক সুস্থতার চর্চায় নতুনদের জন্য নানা ধরনের যোগাসন রয়েছে, যা দৈনন্দিন অভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
নতুনদের জন্য যোগাসন
আপনি যদি যোগাভ্যাসে উৎসাহী হন এবং যোগ শুরু করতে চান, তাহলে নিচের কয়েকটি যোগাসন দিয়ে আপনার সকাল শুরু করা খুবই ভালো। এগুলো নতুনদের জন্য উপযোগী এবং নিজে নিজে বা শ্রী শ্রী যোগ প্রশিক্ষকের নির্দেশনায় সহজেই করা যায়।
আমরা আপনাদের জন্য চারটি সেটে মৌলিক যোগাসন উপস্থাপন করছি, যা নিচের অবস্থানগুলোতে অনুশীলন করা যায়:
- দাঁড়িয়ে করা যোগাসন
- বসে করা যোগাসন
- পেটের উপর ভর দিয়ে শুয়ে করা যোগাসন
- চিৎ হয়ে শুয়ে করা যোগাসন
এই যোগাসনগুলো নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে অনুশীলন করারও পরামর্শ দেওয়া হয়:
- প্রথমে দাঁড়িয়ে করা যোগাসন
- তারপর বসে করা যোগাসন
- এরপর পেটের উপর ভর দিয়ে শুয়ে করা যোগাসন
- সবশেষে চিত হয়ে শুয়ে করা যোগাসনের মাধ্যমে সেশন শেষ করুন।
দাঁড়িয়ে করা যোগাসন
1. কোণাসন (Sideways Bending Pose)

কোণাসন,- পার্শ্ব-বাঁকানো ভঙ্গি নামেও পরিচিত; এতে একটি হাত উপরের দিকে প্রসারিত করা হয় এবং অন্য হাতটি পায়ের পাশে রাখা হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি শরীরের নমনীয়তা, ভারসাম্য ও শক্তি বৃদ্ধি করে। এটি মেরুদণ্ড ও নিতম্বের চাপ ও টান কমাতে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ হ্রাস করে। কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের জন্যও এটি উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, নিতম্ব, মেরুদণ্ড বা ঘাড়ে সাম্প্রতিক বা দীর্ঘমেয়াদী আঘাত রয়েছে, যাদের উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ, মাইগ্রেন বা ডায়েরিয়া আছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
কোণাসনের আরেকটি রূপ হলো কোণাসন-2। এই ভঙ্গিতে দুই হাত ব্যবহার করে পাশের দিকে শরীর বাঁকানো হয়।
2. কটিচক্রাসন (Standing Spinal Twist Pose)

কটিচক্রাসন, দাঁড়িয়ে মেরুদণ্ড মোচড়ানো ভঙ্গি নামেও পরিচিত; এটি মেরুদণ্ড, নিতম্ব ও কোমরকে প্রসারিত ও মোচড়াতে সাহায্য করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং মেরুদণ্ড, ঘাড় ও কাঁধকে শক্তিশালী করে। যারা দীর্ঘ সময় চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হার্নিয়া বা মেরুদণ্ডের সমস্যা আছে, হাঁটুর আঘাত রয়েছে, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদযন্ত্রের সমস্যা আছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
3. হস্তপদাসন (Standing Forward Bend Pose)

হস্তপদাসন, দাঁড়িয়ে সামনে ঝোঁকার ভঙ্গি নামে পরিচিত, নতুনদের জন্য একটি মৌলিক যোগাসন। এতে দেহের উপরের অংশকে ঝুঁকিয়ে মাথা হাঁটুর কাছে আনতে হয়। দুই হাত দিয়ে গোড়ালি বা পাকে ধরার চেষ্টা করতে হয় ।
উপকারিতা: এটি স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে, মেরুদণ্ডকে নমনীয় করে তোলে এবং পিঠের সব পেশিকে প্রসারিত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠ, ঘাড় বা পায়ে সাম্প্রতিক বা দীর্ঘমেয়াদী আঘাত আছে কিংবা মেরুদণ্ডের সমস্যা রয়েছে—তাদের এই আসনটি করা উচিত নয়।
4. অর্ধচক্রাসন (Standing Backward Bend Pose)

অর্ধচক্রাসন, এই ভঙ্গিতে হাত ও পা এমনভাবে বাঁকানো হয় এবং মাথা নিচের দিকে নেওয়া হয় যে শরীরটি অর্ধবৃত্তের (অর্ধচন্দ্রের মতো) আকৃতি ধারণ করে।
উপকারিতা: এটি শরীরের সামনের উপরের অংশকে প্রসারিত করে এবং বাহু ও কাঁধের পেশিকে সুগঠিত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের বাহু, কবজি, কাঁধ, ঘাড়, পিঠ বা নিতম্বে সাম্প্রতিক বা দীর্ঘমেয়াদী আঘাত আছে, অথবা যাদের এমন কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে যার কারণে মাথা নিচু করা বা শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার সমস্যা আছে , তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
5. ত্রিকোণাসন (Triangle Pose)

ত্রিকোণাসনে পা দুটো যতটা সম্ভব ফাঁক করে রাখা হয় এবং এক হাত নিচের দিকে নামানো হয়, অন্য হাতটি উপরের দিকে প্রসারিত করা হয়। এতে শরীরটি ত্রিভুজের মতো আকার ধারণ করে।
উপকারিতা: ত্রিকোণাসন হজমশক্তি উন্নত করে এবং উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও পিঠের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। এটি শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যও বৃদ্ধি করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, পা, নিতম্ব বা পিঠে সাম্প্রতিক বা দীর্ঘমেয়াদী আঘাত আছে, হৃদযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, মাথা ঘোরার সমস্যা আছে অথবা যাদের শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করার সমস্যা আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
6. বীরভদ্রাসন (Warrior Pose)

এই আসনে একটি পা সামনে ও অন্য পা পিছনে রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ভঙ্গিতে দাঁড়ানো হয় এবং দু’টি হাত মাথার উপর প্রসারিত করা হয়।
উপকারিতা: বীরভদ্রাসন সহনশক্তি বৃদ্ধি করে, বাহুকে শক্তিশালী করে, মাধুর্য আনে এবং সাহস জাগায় । যারা দীর্ঘ সময় চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট যোগাসন। ফ্রোজেন শোল্ডারের ক্ষেত্রেও এটি খুব উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, পা, নিতম্ব বা পিঠে সাম্প্রতিক বা দীর্ঘমেয়াদী আঘাত আছে, যাদের উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ কিংবা হৃদযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
7. প্রসারিত পদহস্তাসন (Standing Forward Bend with Feet Apart Pose)

প্রসারিত পদহস্তাসনে পা দু’টি ফাঁক করে ছড়িয়ে রাখা হয় এবং নিতম্ব থেকে শরীরের উপরের অংশ সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে মেঝেতে মাথা ছোঁয়ানোর চেষ্টা করা হয়। হাত দু’টি যতটা সম্ভব প্রসারিত করে হাতের তালু মেঝেতে বা যোগ ব্লকের উপর রাখতে হয়।
উপকারিতা: এটি একটি আরামদায়ক ও স্থিতিশীল আসন, যা হ্যামস্ট্রিং, নিতম্ব ও কোমরের নিচের অংশ প্রসারিত করতে সাহায্য করে এবং মনকে শান্ত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা বা সতর্কতা প্রয়োজন: যাদের কোমরের নিচের অংশে ব্যথা, হাঁটুর আঘাত বা হ্যামস্ট্রিং শক্ত রয়েছে, তারা ব্লকের মতো সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করতে পারেন, যাতে পিঠের উপর চাপ কমে।
এছাড়া যাদের ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত আছে, তাদের মাথা একটু উঁচুতে রাখা উচিত এবং খুব বেশি সামনে ঝুঁকে পড়া এড়ানো দরকার। গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে এই আসনটি এড়িয়ে চলা বা উপকরণের সাহায্যে পরিবর্তিতভাবে করা উচিত।
8. বৃক্ষাসন (Tree Pose)

এই ভঙ্গিতে একটি পা মাটিতে স্থিরভাবে রাখা হয় এবং অন্য পা দাঁড়ানো পায়ের উরুর উপর রাখা হয়, যা গাছের কাণ্ডের মতো দেখায়। সাধারণত দু’টি হাত মাথার উপর তুলে ভঙ্গিটি সম্পূর্ণ করা হয। বৃক্ষাসন পায়ের শক্তি বাড়ায় এবং শরীরের ভারসাম্য ও স্থিরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
উপকারিতা: বৃক্ষাসন মনোযোগ বাড়ানোর জন্য একটি উৎকৃষ্ট যোগাসন। এটি পাদুটিকে শক্তিশালী করে, দেহের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং কোমরের নমনীয়তা বাড়ায়। সায়াটিকার সমস্যায়ও এটি উপকারী-যেখানে ব্যাথা পেলভিক অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে নিতম্ব ও উরু পর্যন্ত ছড়ায়।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, গোড়ালি বা নিতম্বে আঘাত আছে, যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ভার্টিগোর সমস্যা রয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
9. পশ্চিম নমস্কারাসন (Reverse Prayer Pose)

পশ্চিম নমস্কারাসনে পিঠের পিছনে দু’টি হাত জোড় করে প্রণামের ভঙ্গিতে রাখা হয়, যেখানে আঙুলগুলো উপরের দিকে থাকে।
উপকারিতা: এই আসনটি বুক ও কাঁধের প্রসারণে সাহায্য করে, দেহকে সুগঠিত করে এবং মনকে শান্ত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কাঁধে আঘাত আছে বা রোটেটর কাফ ইমপিঞ্জমেন্টের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি পরিবর্তিতভাবে করা বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত। এ ক্ষেত্রে দুই হাতের মাঝে একটি স্ট্র্যাপ বা তোয়ালে ব্যবহার করলে কাঁধের উপর চাপ কমে।
10. গরুড়াসন (Eagle Pose)

গরুড়াসনে হাত ও পা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে ঈগলের মতো আকৃতি তৈরি করা হয়। এই ভঙ্গিতে ভারসাম্য ও মনোযোগ বজায় রাখা জরুরি, পাশাপাশি এটি পা, গোড়ালি ও শরীরের কেন্দ্রীয় পেশিগুলিকে শক্তিশালী করে।
উপকারিতা: এটি শরীরের একটি ভারসাম্যপূর্ণ যোগাসন, যা সমন্বয় ও স্থিরতা উন্নত করে। এটি নিতম্ব, উরু, কাঁধ ও পিঠের উপরের অংশকে প্রসারিত করে। গরুড়াসন বাতরোগ (রিউম্যাটিজম্) ও সায়াটিকার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটুতে আঘাত আছে, ঘাড়ে ব্যথা রয়েছে বা কোমরের নিচের অংশে কোনো সমস্যা আছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
11. উৎকটাসন (Chair Pose)

নতুনদের জন্য এই উপযোগী ব্যায়াম হলো একটি শক্তিবর্ধক আসন, যা পা, পিঠ ও দেহের কেন্দ্রীয় পেশিগুলিকে সুগঠিত করে। এই ভঙ্গিতে হাঁটু ভাঁজ করে নিতম্ব নিচের দিকে নামানো হয়, যেন কল্পিত একটি চেয়ারে বসা হচ্ছে, এবং দু’টি হাত মাথার উপর তুলে ধরা হয়।
উপকারিতা: এটি কোমরের নিচের অংশ ও শরীরকে শক্তিশালী করে, শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু বা গোড়ালিতে আঘাত আছে, কিংবা কোমরের নিচের অংশে সমস্যা রয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
বসে করা যোগাসন
1. জানু শীর্ষাসন (One-Legged Forward Bend)

জানু শীর্ষাসন একটি প্রসারণমূলক যোগাসন, যা হ্যামস্ট্রিং, কোমরের নিচের অংশ ও নিতম্বের উদ্দেশ্যে করা হয়। এই ভঙ্গিতে একটি পা সামনে সোজা করে রাখা হয় এবং অন্য পা ভাঁজ করে সেই পায়ের পাতা অপর পায়ের উরুর দিকে আনা হয়। এরপর শরীরের উপরের অংশ সামনে ঝুঁকিয়ে পায়ের দিকে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি কোমরের নিচের অংশ প্রসারিত করে এবং তলপেটের অঙ্গগুলিকে উদ্দীপিত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটুতে আঘাত আছে বা কোমরের নিচের অংশে কোনো সমস্যা রয়েছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
2. পশ্চিমোত্তানাসন (Seated Forward Bend)

এটি একটি প্রসারণমূলক যোগাসন, যা হ্যামস্ট্রিং, কোমরের নিচের অংশ ও মেরুদণ্ডের উপর কাজ করে। এই ভঙ্গিতে পা দু’টি সামনে সোজা করে রাখা হয় এবং শরীরের উপরের অংশ পায়ের দিকে সামনে ঝুঁকিয়ে হাত দু’টি পা বা গোড়ালির দিকে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
উপকারিতা: পশ্চিমোত্তানাসন পেলভিক অঞ্চলের ও তলপেটের অঙ্গগুলিকে উদ্দীপিত করে এবং কাঁধকে সুগঠিত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কোমরের নিচের অংশ বা হ্যামস্ট্রিংয়ে আঘাত রয়েছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
3. পূর্বোত্তানাসন (Upward Plank Pose)

পূর্বোত্তানাসন বাহু, কাঁধ এবং দেহের কেন্দ্রীয় পেশিগুলির উদ্দেশ্য করা হয়। এই ভঙ্গিতে হাত ও পায়ের উপর ভর দিয়ে শরীরকে স্থিত রাখতে হয় এবং বুক ও নিতম্ব উপরের দিকে তুলে ধরা হয়।
উপকারিতা: পূর্বোত্তানাসন থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা উন্নত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কবজি, কাঁধ বা ঘাড়ে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
4. অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন (Half Spinal Twist)

অর্ধ মৎস্যেন্দ্রাসন একটি মোচড় দেওয়া যোগাসন, যা মেরুদণ্ড ও নিতম্বকে সুগঠিত করে। এই ভঙ্গিতে পা দু’টি ভাঁজ করে রাখা হয় এবং শরীরের উপরের অংশ একটি ভাঁজ করা পায়ের দিকে মোচড়ানো হয়, অন্য হাতটি পিঠের পিছনে প্রসারিত থাকে।
উপকারিতা: এই আসনটি মেরুদণ্ডকে আরও নমনীয় করে তোলে এবং ফুসফুসে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কোমরের নিচের অংশ বা ঘাড়ে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। বসে করা অন্যান্য যোগাসনের মতোই গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকে এটি এড়ানো প্রয়োজন।
5. বদ্ধকোণাসন (Butterfly Pose)

বদ্ধকোণাসন নিতম্ব, উরুর ভেতরের অংশ ও কুঁচকিকে সবল করে। এই ভঙ্গিতে দুই পায়ের পাতা জোড়া করে রাখা হয় এবং হাঁটু দু’টি দু’দিকে মুখ করে থাকে, যা প্রজাপতির ডানার মতো দেখায়।
উপকারিতা: এটি মূত্রথলির সমস্যায় উপকারী, ঋতুকালীন অস্বস্তি কমায় এবং অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটুতে আঘাত আছে বা কোমরের নিচের অংশে সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
6. পদ্মাসন (Lotus Pose)

পদ্মাসন সাধারণত ধ্যান ও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই ভঙ্গিতে দুটি পায়ের পাতা বিপরীত উরুর উপর রাখা হয়, ফলে একটি স্থিতিশীল ও আরামদায়ক বসার ভঙ্গি তৈরি হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি ধ্যানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি ঋতুকালীন অস্বস্তি কমায় এবং হজমশক্তি উন্নত করে। উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা দূর করতেও এই যোগাসন করা যেতে পারে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু বা নিতম্বে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
7. মার্জারিআসন (Cat Stretch)

এটি একটি যোগাসন, যা মেরুদণ্ড, ঘাড় ও নিতম্বকে মজবুত করার উদ্দেশ্যে করা হয়। এই ভঙ্গিতে শরীরকে পর্যায়ক্রমে ধনুকের মতো বাঁকানো ও গোলাকৃতি করা হয়-একটি বিড়ালের মতো। সাধারণত এটি বিপরীত ভঙ্গি ‘গোমুখাসন/কাউ পোজ’-এর সঙ্গে পর পর করা হয়।
উপকারিতা: এটি মনকে শান্ত করে, মেরুদণ্ডকে নমনীয় করে এবং হজমশক্তি উন্নত করে। মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বাড়ানোর জন্য এই যোগাসন অনুশীলন করা যায়।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড় বা কোমরের নিচের অংশে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
8. এক পদ রাজ কপোতাসন (One-Legged Pigeon Pose)

এই যোগাসনটি নিতম্ব, উরু, পিঠ ও বুককে সবল রাখার জন্য করা হয়। এই ভঙ্গিতে হাত ও হাঁটুর উপর ভর দিয়ে শরীরকে রাখা হয়, একটি পা শরীরের পিছনে সোজা করে বাড়ানো হয় এবং অন্য পাটি শরীরের নিচে ভাঁজ করে রাখা হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ উপশম করে। পেলভিক অঞ্চল থেকে নিতম্ব ও উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ব্যথায় কষ্ট পাওয়া ব্যক্তিদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, নিতম্ব বা কোমরের নিচের অংশে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
9. শিশুআসন (Child Pose)

শিশুআসন একটি আরামদায়ক যোগাসন, যা নিতম্ব, উরু ও কোমরের নিচের অংশকে সতেজ করতে করা হয়। এই ভঙ্গিতে হাঁটু দু’টি আলাদা করে রেখে, শরীর সামনের দিকে ভাঁজ করে কপাল মাদুরের উপরে নামিয়ে আনতে হয়। হাত দুটি শরীরের দুপাশে সটান রাখতে হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু বা গোড়ালিতে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
10. চাক্কিচালনাসন (Mill Churning Pose)

চাক্কিচালনাসন শরীরের জন্য একটি উৎকৃষ্ট ব্যায়াম, কারণ এতে হাতে চালানো গম পেষার চাকি ঘোরানোর মতো নড়াচড়া করা হয়। এই আসনে পা দুটি সামনের দিকে ছড়িয়ে শরীরের উপরের অংশকে ডান দিকে ও তারপর বাঁ দিকে মোচড়ানো হয় এবং এই প্রক্রিয়াটি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি পেটের চর্বি কমাতে সাহায্য করে। এটি হজমতন্ত্রকে সক্রিয় করে এবং মেরুদণ্ডের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে। এছাড়া এটি পিঠ ও ঘাড়ের টান কমাতে এবং শরীরে রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করে। ঋতুকালীন ব্যথা কমানোর জন্যও এই যোগাসন করা যেতে পারে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠে আঘাত, মেরুদণ্ডের সমস্যা বা হাঁটুতে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থায় এই যোগাসন অনুশীলনে নিষেধ রয়েছে।
11. বজ্রাসন (Thunderbolt pose)

বজ্রাসন মেঝেতে বসে করা হয়। এই ভঙ্গিতে হাঁটুর মধ্যে সামান্য ফাঁক রেখে গোড়ালির উপর ভর দিয়ে বসা হয়, পায়ের আঙুল পরস্পর স্পর্শ করে থাকে। হাত দু’টি হাঁটুর উপর রাখা হয় এবং পিঠ সোজা রাখা হয়।
উপকারিতা: এটি একটি ধ্যানমূলক আসন এবং প্রায়ই খাবারের পরে হজমে সহায়তা ও রক্তসঞ্চালন উন্নত করার জন্য করা হয়। এটি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে এবং পিঠ ও পায়ের পেশিকে শক্তিশালী করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হাঁটু, পিঠ বা গোড়ালিতে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
12. গোমুখাসন (Cow Face pose)

গোমুখাসন নিতম্ব, উরু ও কাঁধকে মজবুত করতে করা হয়। এই ভঙ্গিতে একটি হাত ভাঁজ করে কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে নেওয়া হয় এবং অন্য হাতটি শরীরের সামনের দিক থেকে পিছনে ভাঁজ করে নেওয়া হয়, যাতে দু’টি হাত একে অপরের দিকে পৌঁছায়।
উপকারিতা: এটি উদ্বেগ ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে এবং পেলভিক অঞ্চল থেকে উরু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ব্যথার উপশম করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কাঁধ বা কবজিতে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার প্রথম ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
পেটের উপর ভর দিয়ে শুয়ে করা যোগাসন
1. বশিষ্ঠাসন (Side Plank pose)

বশিষ্ঠাসন একটি ভারসাম্যপূর্ণ যোগাসন, যা বাহু, কোর ও নিতম্বকে সতেজ রাখতে করা হয়। এই ভঙ্গিতে একটি হাতের উপর ভর দিয়ে শরীর রাখা হয়, পা দু’টি সোজা থাকে এবং মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীর একটি সরল রেখা তৈরি করে।
উপকারিতা: এটি পেটের পেশিকে শক্তিশালী করে এবং শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কবজি বা কাঁধে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
2. অধোমুখ শ্বানাসন (Downward Facing Dog Pose)

এই আসনটি বাহু, পা, পিঠ ও কোর পেশিকে মজবুত করতে করা হয়। এই ভঙ্গিতে শরীর উল্টো অবস্থায় থাকে, হাত ও পায়ের উপর ভর দিয়ে মাথা নিচে রেখে নিতম্ব উপর দিকে তুলে ধরা হয়।
উপকারিতা: মেরুদণ্ড লম্বা করা ও মনকে শান্ত করার পাশাপাশি এই আসনটি মাথাব্যথা, অনিদ্রা ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কবজি, কনুই বা কাঁধে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকেও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন।
3. মকর অধোমুখ শ্বানাসন (Dolphin Plank Pose)

মকর অধোমুখ শ্বানাসন বা ডলফিন প্ল্যাঙ্ক ভঙ্গি একটি যোগাসন, যা প্রায়ই অধোমুখ শ্বানাসনের (নিচের দিকে মুখ করা কুকুর ভঙ্গি) প্রস্তুতি হিসেবে অনুশীলন করা হয়। এই ভঙ্গিতে হাত ও বাহুর উপর ভর দিয়ে শরীর রাখা হয়, পা দু’টি পিছনের দিকে প্রসারিত থাকে এবং পিঠ সামান্য বাঁকানো থাকে।
উপকারিতা: এটি একটি শক্তিবর্ধক ও উদ্দীপক আসন, যা কোর শক্তি গড়ে তুলতে, দেহভঙ্গি উন্নত করতে এবং কাঁধ, বাহু ও পায়ের নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। ভারসাম্য ও সমন্বয় উন্নত করার ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত কার্যকর।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কবজিতে আঘাত আছে বা কার্পাল টানেল সিনড্রোমের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি পরিবর্তিতভাবে করা বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত। এ ক্ষেত্রে কবজির উপর চাপ কমাতে হাতের নিচে ব্লক বা ভাঁজ করা যোগম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।
4. ধনুরাসন (Bow Pose)

ধনুরাসন একটি গতিশীল ও শক্তিদায়ক যোগাসন। এই ভঙ্গিতে পেটের উপর ভর দিয়ে শুয়ে দুটি হাতে গোড়ালি ধরে পা দু’টি উপরের দিকে তুলে শরীর পিছনের দিকে বাঁকানো হয়, ফলে শরীর ধনুকের মতো আকৃতি ধারণ করে। এতে পিঠ, ঘাড় ও পা শক্তিশালী ও প্রসারিত হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি দেহভঙ্গি উন্নত করতে, নমনীয়তা বাড়াতে এবং হজম ও প্রজনন তন্ত্রকে উদ্দীপিত করতে সহায়ক। ভারসাম্য ও সমন্বয় উন্নত করার ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত কার্যকর। ঋতুকালীন সময়েও এই যোগাসন অনুশীলন করা যেতে পারে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠে আঘাত আছে বা স্পাইনাল স্টেনোসিস, হার্নিয়েটেড ডিস্কের মতো মেরুদণ্ডজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা বা কম্বল/ব্লকের মতো সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবর্তিতভাবে করা উচিত। এছাড়া যাদের উচ্চ রক্তচাপ বা ঘাড়ে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা মাথা ও ঘাড় মাটিতে ভর দিয়ে শিথিল ভাবে করা উচিত।
5. ভুজঙ্গাসন (Cobra Pose)

ভুজঙ্গাসন বা কোবরা ভঙ্গি সাধারণত ‘ভিনিয়াসা ফ্লোর ‘ অংশ হিসেবে করা হয়। এই ভঙ্গিতে পেটের উপর শুয়ে কাঁধের নিচে হাত রাখা হয় এবং কনুই শরীরের কাছে রাখা হয়। এরপর বুক মাটি থেকে উপরে তোলা হয়, মাথা ও ঘাড় প্রসারিত থাকে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি ক্লান্তি ও মানসিক চাপ কমায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য উপকারী।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠ বা ঘাড়ে প্রদাহ বা স্লিপড ডিস্ক, মেরুদণ্ডের আঘাতের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে নারীদের এই আসনটি পরিবর্তিতভাবে করা বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
6. সালম্ব ভুজঙ্গাসন (Sphinx Pose)

সালম্ব ভুজঙ্গাসন বা স্ফিঙ্কস ভঙ্গি একটি মৃদু শরীরকে পিছনের দিকে বাঁকানো আসন। এটি বুক প্রসারিত করে এবং ‘হার্ট ওপেনার’ হিসেবে কাজ করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি রক্তসঞ্চালন উন্নত করে এবং পিঠকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড়, পিঠ বা কাঁধে আঘাত আছে বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা প্রশিক্ষিত যোগশিক্ষকের নির্দেশনায় পরিবর্তিতভাবে করা উচিত। গর্ভবতী নারীদেরও এই আসনটি পরিবর্তিতভাবে করা বা সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা উচিত।
7. বিপরীত শলভাসন (Superman Pose)

সুপারম্যান ভঙ্গিতে মাটিতে শুয়ে দুই হাত মাথার দিকে প্রসারিত রাখা হয় এবং পা দু’টি একসঙ্গে উপরের দিকে তোলা হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি দেহভঙ্গি উন্নত করতে সহায়ক। এটি নমনীয়তা বাড়ানোর জন্য এবং পিঠ, নিতম্ব ও পায়ের পেশিকে শক্তিশালী করার জন্য একটি উৎকৃষ্ট যোগাসন। ভারসাম্য ও সমন্বয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত কার্যকর।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠে আঘাত আছে বা স্পাইনাল স্টেনোসিস, হার্নিয়েটেড ডিস্কের মতো সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা কম্বল বা ব্লকের মতো সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবর্তিতভাবে করা প্রয়োজন।
8. শলভাসন (Locust Pose)

শলভাসনে ব্যক্তি পেটের উপর শুয়ে হাত, পা ও শরীরকে মাটি থেকে উপরে তোলে। এটি একটি মধ্যম স্তরের যোগাসন এবং পিঠ, ঘাড় ও পা শক্তিশালী করার জন্য করা হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি সম্পূর্ণ পিঠের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে এবং হজমশক্তি উন্নত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কোমরের নিচের অংশে আঘাত আছে, ঘাড়ে আঘাত আছে বা কবজিতে সমস্যা রয়েছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভবতী নারীদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়, কারণ এতে পেটের উপর চাপ পড়ে।
9. ঊর্ধ্ব মুখ শ্বানাসন (Upward Facing Dog Pose)

ঊর্ধ্ব মুখ শ্বানাসনে ব্যক্তি প্রথমে উপুড় হয়ে শোয়, পেট মাটির সঙ্গে স্পর্শ করে থাকে। এরপর হাত সোজা রেখে হাতে ভর দিয়ে বুক ও পা মাটি থেকে উপরে তোলে।
উপকারিতা: এই আসনটি মেরুদণ্ড, বুক ও পা প্রসারিত করে এবং বাহু, কাঁধ ও পিঠের পেশিকে শক্তিশালী করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের কার্পাল টানেল সিনড্রোম, কবজিতে আঘাত বা কাঁধে আঘাত আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভবতী নারীদেরও এই আসনটি এড়ানো প্রয়োজন, কারণ এতে পেটের উপর চাপ পড়ে। যাদের কোমরের নিচের অংশে ব্যথা বা আঘাত আছে, তাদের খুব সতর্কতার সঙ্গে এই আসনটি করা উচিত।
চিত হয়ে শুয়ে করা যোগাসন
1. নৌকাসন (Boat Pose)

নৌকাসন নতুনদের জন্য একটি উপযোগী যোগাসন, যেখানে শরীর নৌকার মতো আকৃতি ধারণ করে। এটি পেট ও কোমরের নিচের অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের সঞ্চালন দ্রুততর করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি হার্নিয়ার সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য উপকারী। এটি পেটের মেদ কমাতে, হজমজনিত সমস্যা দূর করতে এবং রক্তসঞ্চালন উন্নত করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের সম্প্রতি পেটে অস্ত্রোপচার হয়েছে বা আলসারের সমস্যা আছে, তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। উচ্চ বা নিম্ন রক্তচাপ, হৃদরোগ বা হাঁপানিতে ভোগা ব্যক্তিদেরও এই আসনটি করা পরামর্শযোগ্য নয়।
2. সেতু বন্ধাসন (Bridge Pose)

সেতু বন্ধাসনে শরীরকে সেতুর মতো আকৃতিতে রাখা হয়, যেখানে হাত, পা ও পিঠের উপর ভর দিয়ে শরীর থাকে। এটি একটি মধ্যম স্তরের যোগাসন এবং শারীরিক ও মানসিক—উভয় দিক থেকেই বহু উপকারিতা প্রদান করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি মস্তিষ্ককে শান্ত করে, উদ্বেগ কমায় এবং থাইরয়েড সংক্রান্ত সমস্যা হ্রাস করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত আছে, উচ্চ রক্তচাপ বা চোখের গুরুতর সমস্যা রয়েছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভবতী নারীদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়।
3. মৎস্যাসন (Fish Pose)

মৎস্যাসন একটি যোগাসন যেখানে চিত হয়ে শুয়ে বাহুর সাহায্যে বুক ও মাথা উপরের দিকে তোলা হয়। এই আসনটি ঘাড়, গলা ও বুককে গভীরভাবে প্রসারিত করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় আরাম দেয়। এটি দেহভঙ্গি উন্নত করতে, থাইরয়েড গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করতে এবং মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে সহায়ক।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড় বা কাঁধে আঘাত আছে, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে বা সম্প্রতি ঘাড়, কাঁধ বা বাহুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। যাদের পিঠের সমস্যা রয়েছে, তাদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়।
4. পবনমুক্তাসন (Wind-Relieving Pose)

পবনমুক্তাসন নতুনদের জন্য একটি উপযোগী যোগাসন। এতে চিত হয়ে শুয়ে পা ভাঁজ করে পেটের উপর হালকা চাপ দেওয়া হয়।
উপকারিতা: এই আসনটি হজমে সহায়তা করে, কোমরের নিচের অংশ ও নিতম্বের নমনীয়তা বাড়ায় এবং পেটের গ্যাস বের করতে সাহায্য করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের হার্নিয়া, আলসারেটিভ কোলাইটিস, তীব্র পিঠ বা নিতম্বের সমস্যা রয়েছে, অথবা যাদের সম্প্রতি পেটের অস্ত্রোপচার হয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। গর্ভবতী নারীদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়।
5. সর্বাঙ্গাসন (Shoulder Stand)

সর্বাঙ্গাসনে কাঁধ ও ঘাড়ের উপর সম্পূর্ণ শরীরের ওজন রাখা হয় এবং পা দু’টি ছাদের দিকে সোজা করে তোলা হয়। এটি একটি উন্নত স্তরের যোগাসন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে বহু উপকার প্রদান করে, যেমন রক্তসঞ্চালন উন্নত করা ও মানসিক চাপ কমানো।
উপকারিতা: এই আসনটি কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম ও ভ্যারিকোজ ভেইনের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি রক্তসঞ্চালন উন্নত করে এবং মানসিক চাপ হ্রাস করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত আছে, উচ্চ রক্তচাপ, গ্লকোমা , রেটিনা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সমস্যা বা চোখের অন্য কোনো গুরুতর রোগ রয়েছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। ঋতুস্রাব চলাকালীন বা গর্ভাবস্থায় নারীদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়।
6. হলাসন (Plow Pose)

নতুনদের জন্য অন্তর্ভুক্ত যোগাসনগুলোর মধ্যে হলাসন অন্যতম। এই ভঙ্গিতে চিত হয়ে শুয়ে পা দু’টি মাথার উপর দিয়ে পিছনে নিয়ে গিয়ে মেঝেতে স্পর্শ করানো হয়। এটি ঘাড়, পিঠ ও পায়ে গভীর প্রসারণ এনে দেয় এবং নমনীয়তা বাড়াতে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে, মানসিক চাপ কমায় এবং শরীরের নমনীয়তা বৃদ্ধি করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের ঘাড় বা মেরুদণ্ডে আঘাত আছে, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, বা সম্প্রতি ঘাড়, কাঁধ বা পিঠে অস্ত্রোপচার হয়েছে—তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত। ঋতুস্রাব চলাকালীন বা গর্ভাবস্থায় নারীদেরও এই আসনটি করা উচিত নয়।
7. নটরাজাসন (Lying-Down Body Twist)

নাম থেকেই বোঝা যায়, এই ভঙ্গিতে শরীর মোচড়ানো হয়। এতে এক পায়ের উপর ভর দিয়ে অন্য হাত সামনে বাড়ানো হয় এবং শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি শরীর ও মনে গভীর শিথিলতা আনে। এটি পায়ের পেশি শক্তিশালী করে, শরীরের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং বুক, পিঠ ও নিতম্বের পেশিকে প্রসারিত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের সম্প্রতি বা দীর্ঘদিন ধরে গোড়ালি, হাঁটু বা নিতম্বে আঘাত রয়েছে, অথবা যাদের দেহের ভারসাম্য রক্ষা করতে অসুবিধা হয়-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত।
8. বিষ্ণু আসন (Lying-Down on Sides)

বিষ্ণু আসন একটি যোগ ভঙ্গি যা সাধারণত বিশ্রাম ও মানসিক চাপ কমানোর জন্য করা হয়। এই ভঙ্গিতে শরীর মাটিতে শুয়ে থাকে, হাত ও পা স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত ও শিথিল অবস্থায় থাকে।
উপকারিতা: এটি একটি পুনরুদ্ধারমূলক ভঙ্গি, যা মনকে শান্ত করে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায় এবং ঘুমের গুণগত মান উন্নত করে। এছাড়া পিঠ ও নিতম্বের নমনীয়তা বাড়ায় এবং সারা শরীরে রক্তসঞ্চালন উন্নত করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠে আঘাত আছে বা স্পাইনাল স্টেনোসিস, হার্নিয়েটেড ডিস্কের মতো সমস্যা রয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা কম্বল বা ব্লকের মতো সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবর্তিতভাবে করা উচিত।
9. শবাসন (Corpse Pose)

এই ভঙ্গিতে ব্যক্তি চিত হয়ে মাটিতে শুয়ে থাকে, হাত ও পা সম্পূর্ণভাবে প্রসারিত ও শিথিল অবস্থায় থাকে। শবাসনকে যোগশাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে ধরা হয়, কারণ এটি শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম ও পুনরুজ্জীবনের সুযোগ দেয়। সাধারণত যোগ অনুশীলনের শেষে এই আসনটি করা হয়, যাতে মন শান্ত হয়, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমে এবং ঘুমের মান উন্নত হয়।
উপকারিতা: এই যোগাসনটি গভীর ধ্যানময় বিশ্রাম এনে দেয় এবং রক্তচাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা কমাতে সহায়তা করে।
যাদের এড়িয়ে চলা উচিত: যাদের পিঠে আঘাত আছে বা স্পাইনাল স্টেনোসিস, হার্নিয়েটেড ডিস্কের মতো সমস্যা রয়েছে-তাদের এই আসনটি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা কম্বল বা ব্লকের মতো সহায়ক উপকরণ ব্যবহার করে পরিবর্তিতভাবে করা উচিত।
যোগাভ্যাস শরীর ও মনকে সুস্থ ও বিকশিত করে এবং বহু স্বাস্থ্যগত উপকার এনে দেয়, তবে এটি কখনোই চিকিৎসার বিকল্প নয়। প্রশিক্ষিত শ্রী শ্রী যোগ শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যোগাসন শেখা ও অনুশীলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, অবশ্যই চিকিৎসক ও শ্রী শ্রী যোগ শিক্ষকের পরামর্শ নিয়ে যোগাসন অনুশীলন করা উচিত।
আপনার নিকটবর্তী আর্ট অব লিভিং কেন্দ্রে একটি শ্রী শ্রী যোগ প্রোগ্রাম খুঁজে নিন। কীভাবে করবেন ও এর উপকারিতা বিস্তারিতভাবে জানুন।











