কর্ম কী?
কর্ম শব্দটি একটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত শব্দ, তবুও বেশিরভাগ সময়েই এটিকে বুঝতে ভুল হয়। অনেকেই কর্মকে বন্ধন এবং ভাগ্য হিসেবে দেখে। কিন্তু সংস্কৃতে ‘কর্ম’ শব্দের অর্থ শুধু কাজ বা ক্রিয়া।
একটি ক্রিয়া সুপ্ত ভাবে থাকতে পারে, ভেতরের কোনো অনুভূতিরূপে । ক্রিয়া এখন ঘটতেও পারে। এবং এমনও সম্ভাবনা আছে যে ভবিষ্যতে কোনো ক্রিয়া ঘটবে, এখন যা ঘটছে তার ফলস্বরূপ। এটাই কর্মের তিন রূপ।
যখন সৃষ্টির ইচ্ছা আপনার ভেতর থেকে ওঠে, তখন সেই ইচ্ছা বা অনুভূতিই কর্ম। এটিকে বলা হয় সূক্ষ্ম কর্ম (অতি সূক্ষ্ম স্তরের ক্রিয়া)। আপনার মনে যখনই কোনো ইচ্ছা ওঠে, ধরুন একটি নতুন বাড়ি তৈরি করার, তখন কাজ বা ক্রিয়াটি ইতিমধ্যেই এক অর্থে ঘটে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, স্থপতি যখন বাড়ির নকশা তৈরি করেছেন, তখন এক অর্থে বাড়ি নির্মাণ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে।
তারপর আছে স্থূল কর্ম (ভৌত স্তরের ক্রিয়া), যেমন ইট, পাথর ও গাঁথুনির সামগ্রী আনা এবং সেগুলো দিয়ে বাড়ি তৈরি করা। পঞ্চভূতের জগতের বাইরে যে সূক্ষ্ম ইচ্ছা বা অনুভূতি ওঠে তাকে বলা হয় কর্ম, এবং পাঁচটি প্রধান উপাদানের জগতে যে ক্রিয়া ঘটে তাকেও বলা হয় কর্ম। এ ছাড়াও, ক্রিয়ার ফলে যে ছাপ বা প্রভাব মনের ওপর পড়ে, সেটাও কর্ম হয়ে যায়, যা একজনকে ভোগ করতে হয়।
আপনি এখন যে কাজ করছেন তা আপনার মনে একটি ছাপ তৈরি করছে। এই ছাপ ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্রিয়াকে আকর্ষণ করতে পারে বা ঘটাতে পারে।
ভালো মানুষের সাথে খারাপ ঘটনা কেন ঘটে?
সঞ্চিত হল সেই কর্ম যা আমরা সঙ্গে করে এনেছি। প্রারব্ধ হল সেই কর্ম যা এখন ফল দিচ্ছে। আগামি হল সেই কর্ম যা আমরা ভবিষ্যতে অর্জন করতে পারি। আমাদের সঞ্চিত কর্মকে মুছে ফেলা বা সরিয়ে ফেলা যায়। আধ্যাত্মিক অনুশীলন, প্রার্থনা, সেবা, আশেপাশের মানুষ এবং প্রকৃতিকে ভালোবাসা, ধ্যান—এসব আমাদের অর্জিত কর্ম মুছে দিতে সাহায্য করে।
কখনও কখনও মানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভালো মানুষের সঙ্গে খারাপ ঘটনা কেন ঘটে। আজ আপনি ভালো, কিন্তু আপনি জানেন না গতকাল আপনি কী করেছিলেন।
– গুরুদেব শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর
প্রারব্ধ কর্ম, যা ইতিমধ্যেই ফল দিচ্ছে, সেটিকে ভোগ করতেই হবে। আপনি এমন এক গাড়িতে আছেন যা চলমান। আপনি যখন ‘ ফ্রি-ওয়েতে’ আছেন এবং একটি ‘এক্সিট’ মিস করেছেন, তখন আপনাকে পরের এক্সিট পর্যন্ত যেতে হবে। কিন্তু আপনি লেন বদলাতে পারেন! আপনি দ্রুত গতির লেনে বা ধীর গতির লেনে যেতে পারেন। এক অর্থে স্বাধীনতা আছে, আবার আরেক অর্থে নেই।
আগামী কর্ম হল সেই কর্ম যা আমরা ভবিষ্যতে সৃষ্টি করতে পারি। যদি আপনি আজ প্রকৃতির কিছু নিয়ম লঙ্ঘন করেন, তাহলে ভবিষ্যতে আপনাকে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। আপনি জানেন—আপনি যদি এখন কিছু করেন, ভবিষ্যতে আপনি তার কিছু ফল ভোগ করবেন। জেনে বা না জেনে যে কর্ম আমরা করি, সেই কর্মের ফল ভবিষ্যতে আমাদের ভোগ করতে হয়।
কখনও মানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভালো মানুষের সঙ্গে খারাপ ঘটনা কেন ঘটে। আপনি আজ ভালো, কিন্তু আপনি জানেন না আপনি গতকাল কী করেছেন। যেমন বীজ বপন করবেন, তেমনই ফল পাবেন। কিন্তু প্রতিটি কর্মের ফলের একটি সীমিত সময় থাকে।
কর্ম কীভাবে দহন করা যায়
সঞ্চিত কর্ম ,যা আমরা পূর্বজন্মে অর্জন করেছি তার থেকে মূলত পাঁচটি বিষয় আমাদের জীবনে আসে । জন্ম, জন্মস্থান, এবং যে পিতামাতার ঘরে আপনি জন্মেছেন তা আসে অতীত কর্ম থেকে, আপনার শিক্ষা ও শিক্ষার ধরন এবং আপনি কতটা জ্ঞান অর্জন করবেন এবং তারপর সম্পদ, সেই সম্পদের উৎস। সবশেষে আপনার আয়ু এবং মৃত্যুর ধরন। এই পাঁচটি জিনিস আসে সঞ্চিত কর্ম থেকে, সেই কর্ম থেকে যা আমরা অর্জন করেছি।
এখন, আমরা কতটা ধনী হব, আমরা সচেতনতা কতটা বাড়াতে পারব , আমাদের বিবাহ, সন্তান, এবং আমাদের সামাজিক কাজকর্ম — এই সবই প্রারব্ধ কর্ম। আগামী কর্ম হল , আমরা এগুলো অর্জন করতে যা করি ,তার পরিণতি। তাই এখন কাজ করার এবং আরও কর্ম সৃষ্টি করার একটি নির্দিষ্ট স্বাধীনতা আমাদের আছে। কিন্তু একটি ভাগ্যও আছে, একটি নির্দিষ্ট নিয়তি যা আপনাকে দেওয়া হয়েছে এবং যা আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন না।
কোন কাজগুলো কর্ম সৃষ্টি করে না?
আরও দুই ধরনের কর্ম আছে : মনের মধ্যে গড়ে ওঠা প্রভাব থেকে সৃষ্ট কর্ম এবং পাঁচটি উপাদান—পৃথিবী, জল, আগুন, বায়ু, এবং আকাশের মাধ্যমে ঘটে এমন কর্ম। আরেক ধরনের কাজ আছে যা একজনের স্বভাব থেকে ঘটে, যাকে আপনি কাজও বলতে পারেন না। এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে, যেমন অনৈচ্ছিক ক্রিয়া। একটি শিশু হঠাৎ পড়ে গেলে আপনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গিয়ে তাকে তুলে নেন কারণ এটি আপনার স্বভাব—কারও বিপদে সাহায্য করা আপনার স্বভাবের মধ্যে আছে।
কর্ম বদ্ধ বিষয় নয়। এটি একটি উন্মুক্ত সম্ভাবনা।
– গুরুদেব শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর
যেখানে স্বতঃস্ফূর্ততা থাকে সেখানে আপনার কাজ ঈশ্বরের কাজের মতো— স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা কাজ কোনো কর্ম সৃষ্টি করে না কারণ তা আপনার স্বভাব থেকে আসে। তাই যখন একটি বাঘ বা সিংহ শিকার করে, সে কোনো কর্ম সঞ্চয় করে না। একটি বিড়াল যদি ইঁদুর মারে, তার কোনো কর্ম সঞ্চিত হয় না কারণ এটি তার স্বভাব। সবকিছুই কর্ম এবং প্রত্যেককে কোনো না কোনো কর্ম করতেই হয়।
এতক্ষণ যা নিয়ে আলোচনা করা হল সবই ব্যক্তিগত কর্ম, কিন্তু এছাড়াও আছে পারিবারিক কর্ম, সামাজিক কর্ম এবং সময় বা যুগের কর্মও। যখন কোনো বিমান দুর্ঘটনা ঘটে, একই কর্ম যাদের থাকে তারা একই বিমানে থাকে। কারো যদি সেই কর্ম না থাকে, তবে তারা রক্ষা পায় এবং বিমান পুড়ে গেলেও হেঁটে বেরিয়ে আসে। কোন কর্ম কোন ফল আনে তা নির্দিষ্ট করে বলা প্রায় অসম্ভব।
কিন্তু কর্ম বদ্ধ বিষয় নয়, এটি একটি উন্মুক্ত সম্ভাবনা।











