আমরা সবাই মাঝে মাঝে রাগ করি—কখনো কখনো প্রতিদিনই করি। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় তবে ভালো হয় যদি আমরা সচেতনতার সঙ্গে রাগকে অনুভব করতে পারি।
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ধীরে ধীরে রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, কিন্তু যখন সেখানে পৌঁছায় তখন সেই রাগ আমাদের এবং আমাদের আশেপাশের মানুষদের জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়। আবার কেউ কেউ খুব তাড়াতাড়ি রেগে ওঠে, এবং খুব তাড়াতাড়ি শান্তও হয়ে যায়। তবে কিছুক্ষণ পরে নিরর্থকভাবে আবার একই চক্র শুরু হয়।
এই পুনরাবৃত্ত রাগের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় আছে কি? এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর রাগ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। এবং এই তীব্র আবেগকে কিভাবে অতিক্রম করা যায় তার উপায়ও বলেছেন।
রাগ নির্ভর করে আপনার শক্তি, আপনার আসক্তির মাত্রা এবং জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধির উপর।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর
আপনার রাগ কাদের উদ্দেশ্যে…
আপনি কাদের উপর রাগ করেন? মানুষ, ঘটনা বা পরিস্থিতির উপর? স্পষ্টতই আপনি কোনো জড় বস্তুর উপর রাগ করতে পারেন না। আপনার রাগগুলো তো মানুষ বা পরিস্থিতির উপরেই পড়ে এবং সেই মানুষদের মধ্যে আপনিও রয়েছেন। অর্থাৎ আপনি হয় নিজের উপর রাগ করেন, নয়তো অন্য কারো উপর। একটু সচেতন হয়ে দেখুন—এই দুই ধরনের রাগই অর্থহীন এবং অপ্রয়োজনীয়।
রাগ হওয়া: আসা-যাওয়ার পথ
এমন কি কখনো সম্ভব যে আমরা একেবারেই রাগ করব না? এখন পর্যন্ত আপনার নিজের অভিজ্ঞতা কী বলছে? ছোটবেলায় যখন কেউ আপনার খেলনাটা কেড়ে নিতো, তখন আপনি রাগ করতেন।দুধ, খাবার, টফি বা খেলনা সময়মতো না পেলে আপনি চিৎকার করতেন। আপনি কি এমন করেননি? নিশ্চয়ই করেছেন। তারপর স্কুলে, কলেজে, কর্মস্থলে এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশায়ও আপনার রাগের অভিজ্ঞতা হয়েছে। অর্থাৎ রাগ মানুষের একটি খুবই সাধারণ অনুভূতি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাগ থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসা।
আপনি কত ঘন ঘন রাগ করেন? আপনার রাগের মাত্রা আপনার শক্তির বিপরীত অনুপাতে থাকে। অর্থাৎ আপনি যত শক্তিশালী হবেন, তত কম রাগ করবেন।আপনি যত দুর্বল হবেন, তত বেশি রাগের প্রবণতা থাকবে। তাই আপনাকে দেখতে হবে—আপনার শক্তি কোথায়? আপনি কেন সেই শক্তি হারাচ্ছেন?
দ্বিতীয় বিষয় হলো আপনার দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবন ও আপনার চারপাশের মানুষদের সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি। এটিও রাগের উপর প্রভাব ফেলে।
তৃতীয় বিষয় হলো আসক্তি—আসক্তিই আপনার মধ্যে রাগ জাগিয়ে তোলে। আপনি যা চান তার প্রতি যত বেশি আসক্তি থাকবে, রাগের মাত্রাও তত বেশি হবে। অর্থাৎ আপনার রাগের পেছনে কোন না কোন ইচ্ছা বা কামনা থাকে। আপনাকে সেটা বুঝতে হবে। যদি রাগ আপনার আরাম, ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অহং চরিতার্থ করার জন্য হয়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া একরকম হয়। কিন্তু রাগ যদি সহানুভূতি থেকে আসে, যদি রাগের উদ্দেশ্য হয় কোন ভুলকে ঠিক করা, তাহলে তা ভিন্ন ব্যাপার। এই ধরনের রাগ খারাপ নয়।
ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য রাগকে ব্যবহার করা
রাগকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। রাগ যেন আপনাকে ব্যবহার না করে। বরং যখন প্রয়োজন, তখন আপনিই যেন রাগকে একটা উপায় বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।
কখনো ভাববেন না যে রাগ সবসময় খারাপ। যদি রাগ প্রয়োজন অনুযায়ী কম করে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিদিন রাগ করা হয়, তাহলে তার কোন মূল্য থাকে না, বরং তা আপনার মূল্যই কমিয়ে দেয়।
অতীতের দমিয়ে রাখা রাগ
অতীতের দমিয়ে রাখা রাগ থেকে কিভাবে মুক্তি পাওয়া যায়? যদি আপনি ভাবেন যে আপনার মধ্যে চাপা রাগ আছে এবং তাকে বাইরে বের করে দিতে হবে – তাহলে সেটা কখনো শেষ হবে না। এটা যেন সমুদ্রের ঢেউ থামানোর চেষ্টা করার মতো।
রাগ আলাদা কোন শক্তি নয়। এটা একই শক্তি, যা কখনো রাগ হিসেবে প্রকাশ পায়, কখনো সহানুভূতি হিসেবে; কখনো ভালোবাসা হিসেবে, আবার কখনো উদারতা হিসেবে। অর্থাৎ এটা দুটি ভিন্ন শক্তি নয়, বরং একই শক্তি বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। যেমন ফ্রিজ, বাতি এবং পাখা চালানোর জন্য একই বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়, সেই রকম।
নিজেকে কখনো ভাবতে দেবেন না যে আপনার রাগ অবদমিত অবস্থায় আছে। যখন আপনার জ্ঞান বাড়বে এবং আপনার চোখ সত্য ও বাস্তবকে দেখতে পারবে তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে অতীতের রাগ আসলে আপনার বোকামি এবং অজ্ঞতার ফল ছিল।
রাগী মানুষের সঙ্গে আচরণ
রাগী মানুষের সঙ্গে কিভাবে আচরণ করবেন? তাদের শুধু দেখুন এবং মজা নিন। যেমন দেওয়ালিতে আপনি আতশবাজি নিয়ে খেলেন- আপনি কাছে গিয়ে সেটি জ্বালান, তারপর দ্রুত দূরে সরে যান আর দূর থেকে মজা করে দেখেন। রাগী মানুষের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কাজ করুন—দূর থেকে দেখুন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন তাদের আশেপাশে কোন মূল্যবান জিনিস না থাকে। যেমন আপনি কখনো দামি কার্পেটের উপর বা ঘরের ভেতরে আতশবাজি ফাটান না; বরং বাগানে বা রাস্তায় ফাটান। ঠিক তেমনি রাগী মানুষদের সঙ্গে শুধু মজা করাই উচিত। আসলে রাগী মানুষ না থাকলে পৃথিবীতে এত মজাও থাকত না!
অতীতে যদি আপনি রাগের সময় প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে থাকেন সেটা ভালো হয়েছে। কারণ যদি আপনি তখন রাগ প্রকাশ করতেন তাহলে পরে হয়তো তার জন্য অনুতপ্ত হতেন। তাই এটাকে দমিয়ে রাখা রাগ হিসেবে দেখবেন না। বরং ভাবুন যে সেই সময় আপনার বুদ্ধি যথেষ্ট সচেতন ছিল, তাই আপনি প্রতিক্রিয়া দেখাননি। এটাকে দুর্বলতা নয়, বরং আপনার শক্তি হিসেবে দেখুন। রাগের সময় যদি আপনি প্রতিক্রিয়া না দেখান, তাহলে আপনি জ্ঞানীর মতো আচরণই করেছেন।
প্রচলিত ধারণা যে আমার রাগ ন্যায্য…
রাগ প্রকাশ করলে অন্য মানুষটি ঠিক হয়ে যাবে – এই ধারণা ঠিক নয়। এতে আপনার জীবনও ভালো হয়ে যাবে না। “রাগ দমিয়ে রাখা” – জাতীয় শব্দগুলো আসলে অপরিণত মনোবিজ্ঞানের ফল। একমাত্র জ্ঞান ও প্রজ্ঞা থাকলেই আপনি বুঝতে পারবেন বাস্তবতা কি এবং রাগের প্রতিক্রিয়া আপনার ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য সবসময় ক্ষতিকর। আপনার উচিত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সচেতনভাবে কাজ করা। দমিয়ে রাখা রাগ আসলে প্রতিক্রিয়ার সঙ্গেই সম্পর্কিত। আপনি যদি প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে থাকেন, তাহলে সেটা ভালোই হয়েছে।
প্রশ্ন: অতীতের জন্য রাগ করা কতটা বুদ্ধিমানের কাজ?
গুরুদেব: অতীতের জন্য রাগ করে কোনো লাভ আছে কি?
মোল্লা নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে একটা গল্প আছে। তার ছেলে একটা দামী ইলেকট্রনিক যন্ত্র হাতে নিতে যাচ্ছিল। তখন তিনি ছেলেকে চড় মারেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, “আপনি ওকে মারলেন কেন ?” তিনি উত্তর দিলেন, “ওটা ভেঙে যাওয়ার পরে চড় মারলে কি আর কোনো মজা থাকবে? ”
অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো বিষয় নিয়ে রাগ করা বোকামির লক্ষণ। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কখনো রাগ করি কিনা । কিন্তু আমি কি নিয়ে রাগ করব? যে অতীত ইতিমধ্যে চলে গেছে, তার জন্য? মানুষ সাধারণত এমন কিছুর জন্য রাগ করে যা বর্তমানে ঘটছে। কিন্তু রাগের প্রতিক্রিয়ায় আবার রাগ করা—এটা কত বড় বোকামি! যদি কেউ বারবার একই ভুল করে, তখন আপনি রাগ দেখাতে পারেন, কিন্তু সেই রাগের মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দেবেন না।
জলের উপর আঁকা একটা রেখা যতক্ষণ থাকে, আরোগ্য বর্ধক রাগের আয়ুও ততক্ষণ। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের জন্য রাগ থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
এর মানে এই নয় যে কেউ ভুল করলে আপনি রাগ দেখাবেন না। কিন্তু সেই রাগের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সাধনা (ধ্যান, প্রার্থনা, যোগ ইত্যাদি) আপনার মনকে বিভিন্ন বিকার থেকে রক্ষা করে, অন্যথায় এ আপনাকে আপনার প্রকৃত সত্তা থেকে দূরে নিয়ে যায়।
রাগ থেকে বেরিয়ে আসার সঠিক পথ
যখন রাগ আসে, তখন সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আর যখন রাগ চলে যায় তখন তারপরে অনুশোচনা আসে। তাহলে এই রাগ আর অনুশোচনার চক্র থেকে কিভাবে বের হওয়া যায়? যদি আপনি রাগ প্রকাশ করেন, পরে অপরাধবোধ হয়। যদি প্রকাশ না করেন, মনে হয় আপনি রাগ দমিয়ে রেখেছেন। এই দুই অবস্থার ঊর্ধ্বে উঠতে হলে জীবনকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে- একটা বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে।
যখন আপনি জীবনের প্রেক্ষাপট বদলান, তখন জীবনকে আর সংগ্রাম বলে মনে হবে না। তখন আপনি বুঝতে পারবেন যে এই আবেগগুলো আপনাকে আসলে বেঁধে রাখে না, আপনাকে অপরাধবোধ বা দমবন্ধ অবস্থায় ফেলে না। এগুলো কেবল সাজসজ্জার মতো। সাজসজ্জা যেমন আসল বস্তুর উপর খুব বেশি প্রভাব ফেলে না, ঠিক তেমনি এই আবেগগুলোও আসল সত্তাকে বদলাতে পারে না। এটা যেন কেকের আইসিংয়ের উপর বিভিন্ন রঙ লাগানোর মতন – রঙ বদলায়, কিন্তু কেকের আসল স্বাদ একই থাকে।
স্বাস্থ্যকর রাগ সম্পর্কে আরও পড়ুন।
(গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর-এর জ্ঞানমূলক বক্তৃতা থেকে সংকলিত)











