আপনার জীবন মূলত আপনার অবচেতন মন দ্বারা পরিচালিত হয়। আর অভ্যাস হলো এমন কিছু, যা আপনার অবচেতন মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে।
সব অভ্যাসই খারাপ নয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করা একটি অভ্যাস। আর যদি আপনি দাঁত ব্রাশ না করেন, তাহলে অস্বস্তি লাগে — এবং সেটাই স্বাভাবিক। প্রতিদিন স্নান করাও একটি অভ্যাস। আপনি প্রতিদিন স্নান করেন, আর যদি স্নান না করেন, তাহলে ভালো লাগে না।
একইভাবে, অনেকের কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকে; যদি তারা কফি না পান, তাহলে মাথাব্যথা শুরু হয়। কফি ভালো না খারাপ, তা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে এবং ডাক্তাররাও সে বিষয়ে ভিন্ন মত দেন।
কিছু অভ্যাস আপনাকে কষ্ট দেয়, যা আপনার শরীর, মন বা আত্মার জন্য ভালো নয়।
আপনার কোনো অভ্যাস ভাঙতে না পারার অক্ষমতা আপনাকে পীড়া দেয়। আর যখন কোনো কিছুর কারণে আপনি গভীরভাবে ব্যথিত হন, তখন সেই কষ্টই আপনাকে সেই অভ্যাস থেকে মুক্ত করতে পারে।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর
যেমন ধরুন, যারা মদ্যপান বা সিগারেটের নেশায় আসক্ত। তারা খুব ভালো করেই জানেন যে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তবুও তারা তা করেন। কেন? কারণ অভ্যাস আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু সত্যিকারের আনন্দ দেয় না।
তাহলে এই ধরনের অভ্যাস থেকে মুক্তি পাওয়া যায় কীভাবে? এর তিনটি উপায় আছে:
ভালোবাসা
যদি আপনি এমন কাউকে প্রতিশ্রুতি দেন, যাকে আপনি খুব ভালোবাসেন — ধরুন আপনার মেয়ে, স্ত্রী, মা বা খুব প্রিয় কেউ — তাহলে ভালোবাসার টানেই আপনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।
প্রথমত, যে অভ্যাস আপনাকে কষ্ট দেয় তা ছাড়তে না পারার যন্ত্রণা তো আছেই, তার উপর প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারার কষ্ট আরও বেশি।
যদি অভ্যাসটি খুব গভীরভাবে আপনার মধ্যে গেঁথে থাকে এবং আপনি মনে করেন একেবারে ছাড়তে পারবেন না, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সিদ্ধান্ত নিন। যেমন — “আমি আগামী ১০ দিন” বা “এক মাস” এই অভ্যাস করব না। এক ধাপ করে এগোনো সহজ, আর এতে আপনি সফল হবেন।
ভয়
দ্বিতীয় উপায় হলো ভয়।
যখন ডাক্তার বলেন, “আর একবার ধূমপান করলে আপনার লিভার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে” বা “আপনার ফুসফুস ভেঙে পড়বে,” তখন সেই ভয় থেকেই আপনি অভ্যাসটি ছাড়তে পারেন।
লোভ
তৃতীয় উপায় হলো লোভ।
ধরুন কেউ বলল, “আপনি যদি এক মাস ধূমপান না করেন, তাহলে আপনাকে এক মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে।” তখন আপনি হয়তো বলবেন, “এক মাস কেন, আমি ৩৫ দিন ধূমপান করব না, যেন হিসাব ঠিক থাকে!” অর্থাৎ, কোনো বড় লাভের আশাও আপনাকে খারাপ অভ্যাস ছাড়তে সাহায্য করতে পারে।
তাই এই তিনটি জিনিস — ভয়, ভালোবাসা এবং লাভের আকাঙ্ক্ষা — আপনাকে সেই সব অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করতে পারে, যা আপনি আর রাখতে চান না। তবে নিজেকে কখনও বলবেন না, “আমি চিরদিনের জন্য এটা করব না।” বরং ধীরে ধীরে, এক ধাপ করে এগোন।
ভয় এবং ভালোবাসা — এই দুটিই বেছে নেওয়ার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত আপনি নিজেই উপলব্ধি করবেন “ওঃ! এই অভ্যাস চালিয়ে গিয়ে আমি শুধু কষ্ট আর দুর্ভোগই কিনে নিচ্ছি।” আর যেদিন আপনি সত্যিই এটা উপলব্ধি করবেন, সেদিন সেই অভ্যাস নিজে থেকেই ঝরে যেতে শুরু করবে।
অভ্যাস করে যান। কোনো কিছু তখনই প্রকৃত অভ্যাসে পরিণত হয়, যখন তা দীর্ঘ সময় ধরে, কোনো বিরতি ছাড়া, নিয়মিতভাবে, শ্রদ্ধার সঙ্গে এবং প্রতিদিন সম্মান জানিয়ে করা হয়। তবেই তা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
– গুরুদেব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর
কীভাবে একটি ভালো অভ্যাস গড়ে তুলবেন?
একটি ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে শৃঙ্খলাই হলো মূল চাবিকাঠি। এএক্ষেত্রেও — ভালোবাসা, লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং ভয় ,সেই তিনটি অনুভূতিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।
- ভালোবাসা: আপনি যখন কোনো কিছু ভালোবাসেন, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা করতে ইচ্ছে হয়। আপনি যদি যোগব্যায়াম ভালোবাসেন, তাহলে অবশ্যই করবেন। যদি ওজন তোলা ভালোবাসেন, করবেন। যদি ক্যারাটে ভালোবাসেন, তাহলে কেউ আপনাকে থামাতে পারবে না; আপনি নিজেই তা করতে চাইবেন। যদি সঙ্গীত ভালোবাসেন, তাহলে বসে বসে অনুশীলন করবেন। তাই ভালোবাসাই অভ্যাস তৈরি করে।
- লাভের আকাঙ্ক্ষা: যদি কেউ বলে, “আগামী ৪০ দিন প্রতিদিন সূর্য নমস্কার করলে তুমি এক মিলিয়ন ডলার পাবে”, তাহলে আপনি শুধু ৪০ দিনই করবেন না, নিরাপদ থাকার জন্য ৪৫ দিন করবেন! হয়তো দু’দিন আগে থেকে আর দু’দিন পরে পর্যন্ত করবেন, যেন গণনায় কোনো ভুল না হয়। অর্থাৎ, কোনো বড় লাভের আশাও আপনাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে সাহায্য করতে পারে।
- ভয়: যদি কেউ বলে, “তুমি যদি যোগব্যায়াম না করো, তাহলে আগামী এক মাসের মধ্যে এই এই সমস্যা হবে”, তখন আপনি ভয় পেয়ে যাবেন। আপনি বলবেন, “ওহ! আমি এই সমস্যাগুলো চাই না, তাই আমাকে যোগব্যায়াম করতেই হবে।”
উপসংহার
আপনার জীবন মূলত আপনার অবচেতন মন দ্বারা পরিচালিত হয়। আর অভ্যাসগুলো সেই অবচেতন মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে। খারাপ অভ্যাস ভাঙা এবং ভালো অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য আবেগকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। পরিবারের প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা খারাপ অভ্যাস ছাড়তে সাহায্য করতে পারে; আবার কোনো কাজের প্রতি ভালোবাসা ভালো অভ্যাস গড়ে তোলে। কোনো লাভের আশাও আপনাকে ক্ষতিকর অভ্যাস ছাড়তে এবং ভালো অভ্যাস গড়তে উৎসাহ দিতে পারে। রোগের ভয়ও খারাপ অভ্যাস ছাড়তে ও ভালো অভ্যাস গড়তে সাহায্য করতে পারে। তবে ভয় সবচেয়ে দুর্বল প্রেরণা, লাভের আকাঙ্ক্ষাও দীর্ঘমেয়াদে সবসময় কার্যকর নয়। কিন্তু ভালোবাসা — ভালোবাসাই সবচেয়ে সুন্দর উপায়, যা আপনাকে খারাপ অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে এবং সহজভাবে ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে।











